
ছাপা জান্নাহর বয়স এক মাস চার দিন। গত রোববার সকাল ১০টার দিকে মুঠোফোনে ভিডিও কলে শিশুটির মুখ শেষবার দেখেছিলেন সৌদিপ্রবাসী বাবা শামীম হোসেন। কয়েক ঘণ্টা পর খবর আসে, সৌদি আরবের রিয়াদে কর্মস্থলে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন তিনি। পরিবারটির আক্ষেপ, ছোট্ট ছাপা আর কখনো বাবাকে সামনাসামনি দেখতে পারবে না।
আট মাস আগে বাড়ি থেকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম হোসেন। এবার কফিনে করে দেশে ফিরবেন। কিন্তু একমাত্র সন্তানকে আর কোলে নেওয়া হবে না বাবার। কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের সঙ্গে বাবার শেষ মুহূর্তের স্মৃতি এভাবেই প্রথম আলোকে বলছিলেন শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন।
শামীম হোসেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। গত রোববার দুপুরে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে শামীমসহ ১৬ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে একই এলাকার আরও দুজন—সাব্বির আহমেদ (৩০) ও রবিউল আউয়াল (২৫) আছেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে এক ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে দিঘীরপাড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সরু গলি দিয়ে শত শত মানুষ শামীম হোসেনের বাড়িতে যাচ্ছেন। ‘শামীম ভিলা’ নামের ওই বাড়িতে তখন চলছিল স্বজনদের কান্নার রোল।
ভিড় ঠেলে একটি কক্ষে ঢুকে দেখা হয় শামীম হোসেনের বাবা জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, শামীম ছিলেন তাঁদের একমাত্র সন্তান। কৃষিকাজ করে তাঁদের সংসার চলত। পাঁচ লাখ টাকা ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে যান শামীম। পাঁচ বছর পর ২০২১ সালে দেশে ফিরে ঘরবাড়ি পাকা করে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর দেশে থাকার পর আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন স্ত্রী মিতু খাতুন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা।
এক মাস চার দিন আগে মিতু ও শামীমের মেয়ের জন্ম হয়। প্রবাসে থেকেই শামীম মেয়ের নাম রাখেন ছাপা জান্নাহ। মেয়ের আকিকার জন্যও টাকা পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন তিনি।
সেসব স্মৃতি মনে করে কাঁদতে কাঁদতে মিতু খাতুন বলেন, ‘আমাকে বলত, আগামী রোজার ঈদে এসে মেয়েকে সোনার চুড়ি হাতে দিয়ে কোলে নিবেন। তাঁর সেই আশা আর পূরণ হলো না।’ মেয়েকে কীভাবে বড় করবেন, সেই চিন্তায় স্থির থাকতে পারছেন না তিনি।
আমাকে বলত, আগামী রোজার ঈদে এসে মেয়েকে সোনার চুড়ি হাতে দিয়ে কোলে নিবেন। তাঁর সেই আশা আর পূরণ হলো না।মিতু খাতুন, শামীম হোসেনের স্ত্রী
দিঘীরপাড় থেকে নৌপথে চার কিলোমিটার পশ্চিমে শ্রীপুর গ্রাম। সেখানে নিহত সাব্বির আহমেদের বাড়িতেও চলছে মাতম। বাড়ির প্রবেশমুখে দাদি চেয়ারে বসে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলেন আর কাঁদছিলেন।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তাঁর ছেলে। আগামী ঈদে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। আড়াই বছর আগে শখ করে প্রবাসী ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। তবে স্ত্রীকে এত দিন বাড়িতে আনা হয়নি। আজই প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন সাব্বিরের স্ত্রী।
বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপের অন্ত নেই গোলাম রব্বানীর। বলেন, ‘আজই প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সে তো আর স্বামীকে দেখতে পেলো না। এই কষ্ট কীভাবে সইব?’
আজই প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সে তো আর স্বামীকে দেখতে পেলো না। এই কষ্ট কীভাবে সইব?গোলাম রাব্বানী, সাব্বির আহমেদের বাবা
শ্রীপুর থেকে রিকশাভ্যানে আরও চার কিলোমিটার পশ্চিমে মহিষডাঙ্গা গ্রাম। এ গ্রামের আসলাম হোসেনের ছেলে রবিউল আউয়ালও (২৫) ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। আকামা না থাকায় নিহতের সরকারি তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি।
রবিউল ও তাঁর ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর ভাই বেঁচে গেছেন। প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান অবিবাহিত রবিউল। আগামী ঈদে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান খান গতকাল দুপুরে নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সরকার সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছে। সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।