
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ও আজ শুক্রবার সকালে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো পলাতক। ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন।
গ্রেপ্তার দুই আসামির নাম মোক্তার হোসেন মোড়ল ও আসাদুল মোল্লা। তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন।
আজ সকালে ওসি প্রথম আলোকে বলেন, দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রাম থেকে মোক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে নাজিরের ঘের নামের স্থান থেকে আসাদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুজনই এজাহারভুক্ত আসামি। অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আমরা জানতে পেরেছি, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য যাঁরা জড়িত, তাঁদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জেনেছি। আমরা চাই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক।তাওসিফ রহমান, নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের ভাই
গত সোমবার শামীম (৩৮) ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম মারধর করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে তিনি স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তখন একদল লোক চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে তাঁকে আবার মারধর করে। পরে পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে রাতে মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা হয়। সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার পেটানো হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান।
শামীম হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গতকাল রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য যাঁরা জড়িত, তাঁদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জেনেছি। আমরা চাই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক।’
মামলার এজাহারে কী বলা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাওসিফ জানান, মামলার তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার জন্য পুলিশ অনুরোধ জানিয়েছে। এ কারণে এখনই সব তথ্য তাঁরা প্রকাশ করতে চান না।
প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাওসিফ। তাঁর অভিযোগ, আমিনী এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন।
দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনীর ফেসবুক প্রোফাইলের নাম ‘Fh Ameni’। আজ শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটেও ওই প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এতে ফজলুল হক লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যেকোনো সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন। তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না, যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন। এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন।’
এর আগে গতকাল রাত ১০টা ২২ মিনিটে শামীমকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন ফজলুল হক আমিনী। ওই পোস্টের সঙ্গে শামীমের একটি কথোপকথনের অডিও যুক্ত করেন তিনি। তারও আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে দেওয়া আরেকটি পোস্টে শামীমের মানসিক অসুস্থতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন ফজলুল হক আমিনী।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এলাকার মানুষও তাঁর অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন। শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পাশাপাশি কামিল পাস করেছেন এবং হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।