ফসলি জমির পানিতে চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরের পরমানন্দ সাহা এলাকায়
ফসলি জমির পানিতে চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরের পরমানন্দ সাহা এলাকায়

দক্ষিণাঞ্চলে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে মাছের প্রজনন হুমকিতে

দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী, খাল ও বিলের মাছের মৃত্যুফাঁদ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। মশারির মতো মিহি বুননের এ জাল পানিতে পাতা হলে ছোট-বড় কোনো মাছই সহজে রক্ষা পায় না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন হুমকির মুখে পড়েছে। সেই সঙ্গে মাছের মজুতের ওপর তৈরি হয়েছে চাপ।

স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা জানান, কম পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়ায় গত ছয় বছরে এই জালের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন হাটবাজারে কৌশলে বিক্রি হচ্ছে ‘চায়না দুয়ারি’ জাল।

দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার নদ-নদী ও খাল-বিলে মাছ ধরতে এই জাল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, নির্ধারিত আকারের চেয়ে ছোট ফাঁসের জাল আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক আনিসুজ্জামান বলেন, গেজেটে নাম থাকুক বা না থাকুক, মৎস্য আইনে এই জাল নিষিদ্ধ। ইতিমধ্যে গৌরনদী, আগৈলঝাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। সব মৎস্য কর্মকর্তাকে এই জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মৎস্যবিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, চায়না দুয়ারি প্রচলিত অর্থে শুধু জাল নয়, এটি অনেকটা ফাঁদের মতো কাজ করে। চার কোনা বক্সের মতো লম্বা সুড়ঙ্গের ভেতরে নির্দিষ্ট দূরত্বে লোহার রিং বা স্প্রিং দিয়ে একাধিক খোপ তৈরি করা থাকে। প্রতিটি জালের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৬০ থেকে ১০০ ফুট কিংবা এর চেয়ে বেশি।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ও হারতা বিল দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। দেশীয় মাছের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এ এলাকায় এই জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। হারতা এলাকার জেলে সুরেন মণ্ডল বলেন, ‘এই জাল নিষিদ্ধের বিষয়টি জানতাম না। এখন সবাই এই জাল দিয়েই মাছ ধরে। অন্য জালে মাছ পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে চায়না দুয়ারি ব্যবহার করি।’

১৬ আগস্ট সরেজমিনে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা ও আটিপাড়া গ্রামে দেখা যায়, ফসলি জমির জলাশয়, খাল ও বিলে অসংখ্য চায়না দুয়ারি জাল পাতা। সেখানে আলাপকালে স্থানীয় অন্তত পাঁচ বাসিন্দা জানান, বর্ষার শুরুতেই এসব জাল পানিতে পেতে রাখা হয়। জোয়ারের পানিতে বিলে আসা মাছ ও পোনা জালে আটকা পড়ে। কয়েক ঘণ্টা পরপর শুধু জালের ‘টোন’ খুলে মাছ বের করে আবার সেটি পানিতে পেতে রাখা হয়।

এ জালের খোপগুলোর ভেতরের দিকে একমুখী প্রবেশপথ থাকে। ফলে মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণী ভেতরে ঢোকার পর আর বের হতে পারে না। লোহার রিংয়ের কারণে জালটি ভারী হয়ে নদীর তলদেশে মাটির সঙ্গে সমান্তরালভাবে পড়ে থাকে। স্রোতের সঙ্গে মাছ চলাচলের সময় জালের বিভিন্ন খোপে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ ও পোনাও গিয়ে আটকা পড়ে। বর্ষা মৌসুমে এ জালের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। কারণ, এ সময় দেশীয় মিঠাপানির অনেক মাছ প্রজনন করে।

২০ আগস্ট বরগুনার তালতলী উপজেলার আগাপাড়া, নলবুনিয়া, নিদ্রা, সখিনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির পানিতে এবং খালে চায়না দুয়ারি জাল পেতে রাখা হয়েছে। আগাপাড়া গ্রামের সালাম খা, সরোয়ার বিশ্বাস, হালিম হাওলাদার ফসলি জমিতে এই জাল পাতেন। তাঁরা জানান, এই জাল নিষিদ্ধের বিষয়ে তাঁরা জানেন না।


গবেষণায় সংকটের চিত্র

এক গবেষণায় দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ছয় সদস্যের গবেষণা দল ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে পটুয়াখালী ও বরগুনার দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলের ৪টি এলাকার নদ-নদীতে ১০৫ প্রজাতির মাছে উপস্থিতি শনাক্ত করেছে। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আলমগীর কবির এবং মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জিনতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম রাজিব সরকার।


গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ১০৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১১টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টি বিপন্ন এবং ৭টি মহাবিপন্ন শ্রেণির। মাছের বৈচিত্র্য কমার পেছনে মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক নানা কারণ শনাক্ত করে জরুরি সংরক্ষণব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি ইউরোপীয় প্রাণিবিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চায়না দুয়ারি জালের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ, বিপন্ন ও মহাবিপন্ন শ্রেণির মাছের বিলুপ্তির ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

এ জালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনো যথেষ্ট ধারণা ও সচেতনতা তৈরি হয়নি। দ্রুত এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ আরও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতিও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
মীর মোহাম্মদ আলী, সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

২৪ আগস্ট পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা সদর ইউনিয়নের কাঠালিয়া ও নাঙ্গলী এলাকার বিভিন্ন খাল-বিলে অভিযান চালিয়ে প্রায় ছয় হাজার মিটার চয়না দুয়ারি জাল জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ। পরে জব্দ করা এসব জাল জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া বরগুনার বেতাগী উপজেলায় অভিযান চালিয়ে অন্তত তিন হাজার মিটার এ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলে প্রশাসন।

কাগজে বাড়ছে মাছ, জেলেদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, নদী ও প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ আহরণ গত চারটি অর্থবছরে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ অঞ্চলে নদী ও প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ আহরণ হয়েছিল ৩৯ হাজার ৮২০ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪১ হাজার ৪৫০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৯০০ টনে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৪৪ হাজার ৬০০ টনে দাঁড়িয়েছে।
তবে নদীর মাছের বৈচিত্র্য নিয়ে পরিচালিত গবেষণার ফল এবং জেলেদের মাঠ-অভিজ্ঞতায় ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। বরগুনার বিষখালী নদীর তীরের মাছখালী গ্রামের জেলে আবদুর রহিম জানান, একসময় একাই বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। এখন মাছ কমে যাওয়ায় বছরখানেক আগে চারজন মিলে ভাগে জাল ও নৌকা নিয়েছেন। তাতেও প্রতিদিন মাছ পাওয়া যায় না। যেদিন মাছ পান, সেদিন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা ভাগে পান। রহিম আরও বলেন, ‘আগে গাঙে নামলে তিন-চার হাজার টাহা আয় অইত। এহন তো মাছই নাই, আয় অইবে ক্যামনে?’

চায়না দুয়ারি জাল দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য নতুন হুমকি উল্লেখ করে ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, এ জালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনো যথেষ্ট ধারণা ও সচেতনতা তৈরি হয়নি। দ্রুত এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ আরও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতিও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।