দুজন চিকিৎসকসহ ২৪ পদের ২৩টিই শূন্য। ১৯টি কক্ষের ১৭টিই অব্যবহৃত পড়ে আছে।
চিকিৎসাকেন্দ্রটি প্রায় চার একর জায়গার ওপর অবস্থিত। পুরোনো ভবনটির পুরোটাই পরিত্যক্ত। নতুন ভবনে অস্ত্রোপচার (ওটি) কক্ষসহ ১৯টি কক্ষ আছে। এর মধ্যে ১৭টিই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। চারপাশে নোংরা পরিবেশ। চিকিৎসকের ২টি পদসহ মোট পদ আছে ২৪টি। একজন নিরাপত্তা প্রহরী ছাড়া বাকি ২৩টি পদই শূন্য। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা থেকে সপ্তাহে দুই দিন একজন চিকিৎসক আসেন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের তিনি ওষুধ লিখে দেন। আর সারি করে দাঁড় করিয়ে রোগীদের ওষুধ দেন নিরাপত্তা প্রহরী।
এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ১০ শয্যাবিশিষ্ট পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিত্র। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থান। বছর তিনেক ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
গুনিয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, আড়াই থেকে তিন বছর আগে এখানে চিকিৎসক থাকতেন। তখন প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ রোগী হতো। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসার বেহাল অবস্থা চলছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিবেশও নোংরা। চিকিৎসার কোনো পরিবেশ নেই। কোনো সেবাই পাওয়া যায় না। দুই দিন ডাক্তার আসেন, বাকি পাঁচ দিনই মানুষ এসে ফিরে যান।
জনবল নিয়োগের বিষয়ে প্রতি মাসেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। নতুন নিয়োগ হলে এখানে চিকিৎসক-নার্স পাব বলে আশা করছি।অদিতি রায়, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, নাসিরনগর
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাসিরনগরে ১৯৭৫ সালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। এরও আগে ১৯৬৫ সালে এই পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গুনিয়াউক ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। উপজেলার পূর্বভাগ, চাপরতলা ও হরিপুর ইউনিয়ন এবং হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের লোকজন এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বি এম ফরহাদ হোসেনের বাড়ি এই গ্রামে। ২০১৮ সাল থেকে তিনি সংসদ সদস্য থাকার পর এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক-নার্স সবই ছিল। রোগীও ভর্তি থাকত। তবে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে বি এম ফরহাদ হোসেন পরাজিত হওয়ার পর তিন বছর ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে কোনো চিকিৎসক নেই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে মোট পদ আছে ২৪টি। এর মধ্যে চিকিৎসকের পদ দুইটি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ চারটি, সহ-সেবকের পদ চারটি, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) পদ একটি, ফার্মাসিস্টের পদ একটি, অফিস সহায়কের পদ চারটি, ওয়ার্ড বয়ের পদ দুটি, কুক মশালচির পদ দুটি, নিরাপত্তা প্রহরীর পদ দুটি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ দুটি।
২০১৪ সাল থেকে আমি এখানে আছি। এত দিন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। গত দুই মাস ধরে সপ্তাহে দুই দিন চিকিৎসক আসে। তাই রোগীও তেমন আসে না।কামাল উদ্দিন, নিরাপত্তা প্রহরী
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যে কাগজে-কলমে বর্তমানে পাঁচজনকে কর্মরত দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সিনিয়র স্টাফ নার্স একজন, ওয়ার্ড বয় একজন, কুক মশালচি দুইজন ও নিরাপত্তা প্রহরী একজন। কিন্তু বাস্তবে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। তিনি নিরাপত্তা প্রহরী কামাল উদ্দিন। গত ১ জুলাই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ নার্স লাকি আক্তারের (২৮) মৃত্যু হয়। আর ওয়ার্ড বয় ও কুক মশালচিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বপালন করেন। এর বাইরে দুই মাস ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সপ্তাহে দুই দিন সময় দেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা সাইদুল মোস্তফা। এ ছাড়া চলতি মাসের প্রথম দিন মেডিকেল টোকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) রমজান আলী খানকে অস্থায়ীভাবে এখানে পাঠানো হয়।
নিরাপত্তা প্রহরী কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৪ সাল থেকে আমি এখানে আছি। এত দিন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। গত দুই মাস ধরে সপ্তাহে দুই দিন চিকিৎসক আসে। তাই রোগীও তেমন আসে না। বর্তমানে এখানে কর্মরত আমিই আছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন বলে জানান চিকিৎসক সাইদুল মোস্তফা। তিনি বলেন, এ সময় গড়ে ৭০-৮০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অনেক সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাত্রিকালীন ডিউটি করে সকালে এখানে এসে সময় দেন তিনি।
১ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ১৯টি কক্ষের মধ্যে একটিতে চিকিৎসক সাইদুল মোস্তফা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। পাশের আরেকটি কক্ষে বসে রোগীদের কয়েক ধরনের ওষুধ সরবরাহ করছেন নিরাপত্তা প্রহরী ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
হাসপাতালে আসা গুনিয়াউক গ্রামের বাসিন্দা মমতাজ বেগম বলেন, ‘প্রায়ই মাথাব্যথা ও হাত-পা জ্বালাপোড়া করে। তিন দিন আইয়্যা ফিরা গেছি। আজকা ডাক্তার পাইছি। কিছু ওষুধ দিছে। কইছে ভালা অইয়্যা যাইব গা।’
এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবলের তীব্র সংকটের কথা স্বীকার করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অদিতি রায়। সে জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একজন চিকিৎসক ও একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে (ডেন্টাল) সেখানে সংযুক্তিতে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। অদিতি রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনবল নিয়োগের বিষয়ে প্রতি মাসেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। নতুন নিয়োগ হলে এখানে চিকিৎসক-নার্স পাব বলে আশা করছি। তখন ১০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগীও ভর্তি থাকতে পারবে।’