
জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিভিন্ন সমবায় সমিতি থেকে আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করে প্রশাসনিক সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা। দ্বিতীয় দিনের মতো আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে এ কর্মসূচি শুরু করা হয়, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে বলে তাঁরা ঘোষণা দিয়েছেন।
আন্দোলনকারী ব্যক্তিদের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরে তাঁরা আমানতের টাকা ফেরতের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গেছেন। সমিতিগুলোর মালিকপক্ষকের সঙ্গে কথাও বলার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশসহ টানা আন্দোলন কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। কিন্তু টাকা ফেরত পাওয়ার তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। মাঝখানে কিছুদিন আন্দোলন বন্ধ ছিল। কারণ, ওই সময়ে নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। গতকাল সোমবার থেকে আবার আন্দোলন শুরু করা হয়েছে। যত দিন টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা না পাওয়া যাবে, তত দিন এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বরং আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
মাদারগঞ্জে বিভিন্ন সমবায় সমিতিতে আমানতকৃত অর্থ উদ্ধার আন্দোলন কমিটির ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও অংশ নেন। আজ দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে জড়ো হন। এরপর তাঁরা পরিষদের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে কার্যালয় ঘেরাও করেন। এতে উপজেলা পরিষদসহ ২৩টি দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, তাঁদের পিট এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। সমিতিগুলোতে জমানো টাকাগুলোই অনেকের একমাত্র মূলধন ছিল। অনেক কষ্টে উপার্জন করা টাকাগুলো লাভের আশায় তাঁরা রেখেছিলেন। এখন লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বছর ধরে নিজেদের সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে এই টাকা ওঠাতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা। কিন্তু কোনো ফলাফলই পাচ্ছেন না। যখন আন্দোলন শুরু হয়। তখন প্রশাসন আলোচনায় বসে নানা রকম প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু যখন আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়, তখন আর প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ থাকে না। ফলে এবার টানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে।
আন্দোলন কমিটির সংগঠক মাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাজারো গ্রাহকের কষ্টে অর্জিত টাকাগুলো সমিতিগুলোতে রাখা হয়েছিল। এত কিছুর পরও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। গ্রাহকেরা এবার কঠোর অবস্থানে আছেন। তাঁরা এবার টানা আন্দোলনে থাকার কথা বলেছেন। তাই আমরা তাঁদের সঙ্গে আছি। গতকালের আন্দোলনের সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। কিন্তু তাঁরা এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন অব্যাহত আছে। আজ পুরো উপজেলাকে অবরুদ্ধও করা হয়েছে। এই আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
জেলা সমবায় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের ৭৩০ কোটি টাকা সমবায় সমিতিগুলোতে ছিল। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দাবি, ২৩টি সমিতির মধ্যে আল-আকাবা, শতদল, স্বদেশ, নবদীপ, হলিটার্গেট ও রংধনু অন্যতম। ৬টি সমিতির কাছে জমা আছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। শুধু মাদারগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা সমিতিগুলোতে আছে। এ ছাড়া ইসলামপুর, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী ও জামালপুর সদরে কয়েক হাজার গ্রাহক আছেন।
আন্দোলন কমিটির মুখ্য সংগঠক শিবলুল বারী বলেন, গতকালের আন্দোলনের পর গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা হয়। সবাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মতামত দেন। ফলে দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন চলছে। স্থানীয় প্রশাসন টাকা ফেরতে উদ্যোগ গ্রহণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, গতকালের মতো আজও ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা আন্দোলন চালাচ্ছেন। তাঁরা উপজেলার ২৩টি দপ্তরের প্রশাসনিক সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা আলোচনাও করতে চান না। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। কোনো ধরনের সেবাপ্রার্থীদের অফিসে ঢুকতেও দিচ্ছেন না। এদিকে জুন মাস চলছে। প্রতিটি দপ্তরে অনেক কাজ রয়েছে। এভাবে চললে অনেক দপ্তরের প্রকল্পের টাকা ফেরত যাবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।