গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত সাত দিনের ব্যবধানে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ১৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের তিনজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দুজন নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশুসহ নয়জন ভ্যাকসিন নেওয়ার পর বাড়িতে আছেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীকাল শনিবার থেকে কুকুরকে ভ্যাকসিন (রেবিস কিল) দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে সার্বিক বিষয় তদারক করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি, কঞ্চিবাড়ি এবং পাশের ছাপড়হাটি ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় একটি বেওয়ারিশ কুকুর নারী-শিশুসহ অন্তত ১৪ জনকে কামড়ে আহত করে। পরদিন থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেন। কয়েকজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়।
মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন—কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫), ধুবনী বাজার গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে ফুল মিয়া (৫২), পূর্ব ছাবারহাটি গ্রামের খোকা বর্মণের ছেলে রতনেশ্বর বর্মণ (৪২), মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগম (৪০) এবং আবদুস সালামের স্ত্রী সুলতানা বেগম (৩৯)।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, গোলেনুর বেগম, মিতু আক্তার, আতিকুর মিয়া, লাবণ্য আক্তার ও বিজয় হোসেন।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিহত ব্যক্তিদের কুকুরে কামড়ানোর ঘটনা, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লক্ষণ ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সম্ভবত তাঁরা জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।’ তিনি বলেন, আহত ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান ঠিকভাবে পরিষ্কার না করা, মাথার কাছাকাছি কামড়, আরআইজি না পাওয়া, কোল্ড চেইন সমস্যা বা চিকিৎসায় বিলম্বের মতো কারণ থাকতে পারে।
সিভিল সার্জন জানান, বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সুন্দরগঞ্জে স্বাস্থ্য বিভাগের সাত সদস্যের একটি দল কাজ করছে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন ও আরআইজি মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, আক্রান্ত ও নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে স্বজন এবং স্থানীয় মানুষের ভিড়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
কুকুরে কামড়ে আহত মিতু আকতার (১৬) বলে, ‘বাড়ির উঠানে বসে ছিলাম। হঠাৎ একটি কুকুর এসে আমার হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আমি হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছি।’
লাবণ্য আক্তার (১১) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলে যাওয়ার সময় কুকুর তার মুখমণ্ডলে কামড় দেয়। চিকিৎসা শেষে সে এখন বাড়িতে। লাবণ্য জানায়, এখন ভালো আছে সে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেউ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাননি; তাঁরা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি বলেন, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নথি এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বাড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাজার, রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় এসব কুকুর অবাধে ঘোরাফেরা করছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোজাম্মেল হক বলেন, গত তিন বছরে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকার বরাদ্দ আসেনি। তবে পোষা কুকুরের জন্য সীমিত ভ্যাকসিন ছিল।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ভ্যাকসিন প্রদানের জন্য আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জ থেকে ১৮ সদস্যের টিম গাইবান্ধায় আসবেন। প্রাথমিকভাবে চার থেকে পাঁচ হাজার কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।