
আরাকান আর্মির বন্দিশালায় আট মাস ধরে লোহার শিকল পরিয়ে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আটকে রাখা হয়। তাঁদের দিয়ে কৃষিকাজ, বাংকার তৈরি ও রাস্তা মেরামতের কাজ করানো হতো। খাবার দেওয়া হতো দিনে দুবার শুঁটকি-ভাত। যুদ্ধবিমানের বোমা হামলার আতঙ্কের মধ্যেও তাঁদের দিন কাটে। ১৯ আগস্ট বিজিবির প্রচেষ্টায় তাঁরা দেশে ফেরেন।
ভারী লোহার শিকল প্রত্যেকের পায়ে। ওই অবস্থায় বন্দিশালায় বসে শুনতেন মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ। বিমান থেকে ফেলা বোমার আঘাতে থেকে থেকে কেঁপে উঠত চারপাশ। খাবার বলতে মাত্র দুবেলা শুঁটকি দিয়ে ভাত। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) বন্দিশালায় টানা আট মাস এমন অভিজ্ঞতায় কেটেছিল বাংলাদেশি জেলেদের একেকটি দিন।
জোয়ারের স্রোতে ভুলবশত সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধে’ এই জেলেদের জীবন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ আট মাস ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে অবশেষে বিজিবির প্রচেষ্টায় ১৯ আগস্ট ঘরে ফিরেছেন ২৪ বাংলাদেশি জেলে। মুক্ত হওয়া জেলেরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বন্দিদশার আতঙ্ক।
আরাকান আর্মির সদস্যরা বারবার জানতে চেয়েছিল, আমরা আরসা কিংবা আরএসওর সদস্য কি না। বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের মংডুর একটি কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দী অবস্থায় প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কৃষিকাজের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য বাংকার (গর্ত) তৈরি এবং ভাঙা রাস্তা মেরামতের কাজ করতে হতো। দিনে দুবেলা শুধু শুঁটকি মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হতোমো. আবদুল্লাহ, বাংলাদেশি জেলে
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে দখলে রেখেছে আরাকান আর্মি। এই এলাকা পুনরুদ্ধারে আরাকান আর্মির অবস্থানে প্রতিনিয়ত বিমানে হামলা, বোমা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রাখাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাফ নদীর বিপরীত তীরের বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কয়েক লাখ মানুষের জীবনেও পড়েছে। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি বাংলাদেশি জেলেরা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ঠিকমতো মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। মাঝেমধ্যেই নৌকাসহ বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৮ আগস্ট নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম জলসীমা থেকে তিনজন বাংলাদেশি জেলেসহ একটি মাছ ধরার নৌকা ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
১৯ আগস্ট দুপুরে নাফ নদীর মধ্য ভাগে শূন্যরেখায় বিজিবির কাছে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে আরাকান আর্মি। টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ফিরিয়ে আনা ২৪ জেলের পরিচয় যাচাই করে তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
সেন্ট মার্টিনের আব্দুল্লাহর সঙ্গে যা ঘটেছিল
ফিরে আসা ২৪ জেলের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানতে পারে প্রথম আলো। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম পাড়ার মো. ইলিয়াসের একটি ইঞ্জিননৌকা নিয়ে ছয় জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। জেলেদের একজন সেন্ট মার্টিনের পশ্চিমপাড়ার মো. আবদুল্লাহ। তিনি জানান, সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে ‘সিতার লামা’ এলাকায় জাল ফেলার পর রাখাইন রাজ্যের দিক থেকে স্পিডবোটে এসে ৮-৯ জন আরাকান আর্মির সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাঁদের জিম্মি করে। হাত-পা বেঁধে রাখাইন রাজ্যের একটি ঘাঁটিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আরাকান আর্মির সদস্যরা বারবার জানতে চেয়েছিল, আমরা আরসা কিংবা আরএসওর সদস্য কি না। বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের মংডুর একটি কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দী অবস্থায় প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কৃষিকাজের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য বাংকার (গর্ত) তৈরি এবং ভাঙা রাস্তা মেরামতের কাজ করতে হতো। দিনে দুবেলা শুধু শুঁটকি মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।’
দীর্ঘ আট মাস পর ১৬ আগস্ট মুক্তি পান আব্দুল্লাহসহ ওই ট্রলারের চার জেলে। ১৯ আগস্ট ২৪ জনের দলের সঙ্গে আবদুল্লাহও টেকনাফের জেটিঘাটে ফিরে আসেন।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের পূর্ব দিক থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির স্পিডবোট সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আরেকটি নৌকা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং নৌকার পাঁচ জেলেকে চোখ বেঁধে মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে যায়। তাঁদের একজন মো. নুরুল আলম বলেন, প্রথমে তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তাঁরা কেন মিয়ানমারের জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। এরপর জানতে চাওয়া হয়, তাঁরা সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত কি না।
নুরুল আলম বলেন, প্রথম রাতে তাঁদের প্লেটে করে অল্প পরিমাণ ভাতের মাড় খেতে দেওয়া হয়। এরপর দুই পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ফেলে রাখা হয়। কিছুদিন পর দুপুরে ও সন্ধ্যার আগে দুবেলা ভাত দেওয়া শুরু হয়। ভাতের সঙ্গে দিত শুঁটকি মাছের তরকারি। বন্দিদশার ছয় দিনের মাথায় তাঁদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তা সংস্কার ও মাটি কাটার কাজ করানো হতো তাঁদের দিয়ে। এভাবেই দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাঁদের আট মাস কেটেছে।
ফিরে আসা আরেক জেলে জসিম উদ্দিন বলেন, গত জুলাই মাসে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের এলাকায় সরকারি বাহিনী যুদ্ধবিমানে হামলা শুরু করে। তখন বিস্ফোরণে মংডু শহর কেঁপে উঠত। বন্দিশালায় তখন সবাই আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করে দিতেন। আরাকান আর্মিও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালাত, যার বিকট শব্দ কানে বাজত। বোমা হামলায় আশপাশের বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেছেন তাঁরা। যুদ্ধের ওই সময়ে তাঁদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। সকাল ১০টার দিকে একবার এবং বিকেল ৪টার দিকে আরেকবার শুকনো মাছ ও ডাল দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।
ঝুঁকি নিয়ে মাছ আহরণ
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, আরাকান আর্মি ২০২৪ সালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদী ও সাগরে বাংলাদেশি জেলেরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। নদী-সাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জলসীমা বুঝতে না পারায় জেলেরা অসাবধানতাবশত সীমানা পার হন। তখনই আরাকান আর্মি তাঁদের ধরে নিয়ে যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে টেকনাফের কয়েকজন জেলে জানান, মিয়ানমার জান্তা সরকারের আমলেও নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণাংশ থেকে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নেওয়া হতো। বিজিবির প্রচেষ্টায় অপহৃত জেলেরা ফিরে এলেও কোনো আমলেই তাঁদের নৌকা বা ট্রলার ফেরত দেওয়া হয় না। বাংলাদেশি এসব নৌকা আরাকান আর্মি নিজেদের কাজে ব্যবহার করে।