‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পাওয়া মিডিল চরে যেতে নৌকায় উঠেছেন দর্শনার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীর ডগার ঘাটে
‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পাওয়া মিডিল চরে যেতে নৌকায় উঠেছেন দর্শনার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার  রাজশাহীর ডগার ঘাটে

রাজশাহীর পদ্মার চরে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’

পদ্মার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলেছে। রাজশাহী নগরের সাতবাড়িয়া ডগার ঘাট থেকে নৌকায় ১০–১২ মিনিটের পথ। নৌকা থেকে নামতেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। কোথাও গরুর পাল, কোথাও কৃষকের আবাদ। পাশে পদ্মার পানি, দূরে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। ঘাটে সারি সারি বাঁধা নৌকা।

বিকেলের নরম আলোয় সবুজ মাঠ আর পদ্মার পানিতে বদলে যায় চরটির চেহারা। রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এ জায়গাটিই স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মিডিল চর’ নামে। তবে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর নতুন পরিচয়—‘মিনি সুইজারল্যান্ড’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিনি সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিতি পাওয়ার পর গত ১০–১৫ দিনে বদলে গেছে চরটির চিত্র। চরের ভিডিও দেখে প্রতিদিন ছুটে আসছেন রাজশাহীসহ আশপাশের এলাকার মানুষ। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মানুষ চরে ঘুরতে আসছেন। অথচ কিছুদিন আগেও বাইরের মানুষের তেমন আনাগোনা ছিল না।

কেন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’

যত দূর চোখ যায়, চরজুড়ে সবুজ ঘাস। কোথাও দল বেঁধে চরে বেড়াচ্ছে গরু। কোথাও চলছে কৃষিকাজ। এই চেনা গ্রামীণ দৃশ্যই এখন দর্শনার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে ছবি তোলা ও ঘোরাঘুরির আকর্ষণ।

এই বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠই এখন দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শহিদুল বলেন, চরের বিস্তীর্ণ জমিতে সবুজ ঘাস আর সেখানে চরে বেড়ানো গরুই এখন দর্শনার্থীদের বড় আকর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জায়গাটি মিনি সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিতি পেয়েছে।

চরটির সৌন্দর্য নতুন নয়, গত বছরও এমনই ছিল মন্তব্য করে স্থানীয় যুবক মো. রাব্বিল ইসলাম বলেন, কিন্তু তখন বাইরের মানুষ এ সম্পর্কে জানতেন না। কনটেন্ট নির্মাতা ও সাংবাদিকেরা এসে ভিডিও করার পর ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে। রাব্বিলের কাছে বিকেলের দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর। তাঁর ভাষায়, সবুজ পরিবেশ, গ্রামের জীবন আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী মিলে চরটিকে আলাদা করে তুলেছে।

দল বেঁধে চরে বেড়াচ্ছে গরু ও ভেড়া। বৃহস্পতিবার মিডিল চরে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে ছুটছেন তরুণেরা

রাজশাহী নগরের বাসিন্দা মুবাশ্বির বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন ফেসবুকে ভিডিও দেখে। বৃহস্পতিবার সকালে চরে এসে দুপুর পর্যন্ত ছিলেন। নৌকায় ঘোরার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবলও খেলেছেন। মুবাশ্বির বলেন, ‘ফেসবুকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলে প্রচারণা হচ্ছে। দেখে ভালোই লাগল। পুরোটা অনেক ফাঁকা। খেলাধুলা করেছি, ফুটবল খেলেছি। এটা আরও ভালো লেগেছে।’

নগর থেকে চরে যাওয়ার খরচও খুব বেশি নয়। সাতবাড়িয়া ডগার ঘাট থেকে নৌকায় জনপ্রতি আসা-যাওয়ার ভাড়া ৫০ টাকা। তাই কম খরচে পদ্মার চর ঘুরে দেখার সুযোগও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।

দর্শনার্থীর ভিড়, বেড়েছে নৌকার ব্যস্ততা

দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নৌকার ব্যস্ততাও। চরের বাসিন্দা মো. আজাদ আলী বলেন, আগে দুই-তিনটি নৌকা চলাচল করত। এখন লোকজন বেড়ে যাওয়ায় ১০–১৫টি নৌকা যাওয়া-আসা করছে।

ড্রোনে ধারণ করা চরটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানান ডগার ঘাটের ইজারাদার মো. শাফিউল্লাহ। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে ঘাটে ১২টি নিবন্ধিত নৌকা আছে। দর্শনার্থী বাড়ায় নৌকার মালিকদের আয় বেড়েছে। তবে ভাড়া বাড়ানো হয়নি।

চরে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার মিডিল চরে

সৌন্দর্যের সঙ্গে বাড়ছে ময়লাও

মানুষের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরে বসতে শুরু করেছে নতুন নতুন দোকান। কেউ খাবার বিক্রি করছেন, কেউ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এতে দর্শনার্থীদের সুবিধা হলেও তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। চরের মাঠজুড়ে দেখা যাচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ নানা ধরনের বর্জ্য। স্থানীয় বাসিন্দা পিয়ারুল বলেন, দর্শনার্থীরা ময়লা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেললে চরটির সৌন্দর্য ধরে রাখা সম্ভব।

দর্শনার্থী ও দোকানদারদের নির্দিষ্ট পাত্রে ময়লা ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ডগার ঘাটের ইজারাদার শাফিউল্লাহ বলেন, ডাস্টবিন দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়েছে।

পরিযায়ী পাখির বিচরণস্থলও

মিডিল চর শুধু মানুষের বিনোদনের জায়গা নয়, এটি বিভিন্ন দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিরও বিচরণস্থল। হঠাৎ মানুষের এমন ভিড় পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গরুর পাল যেখানে চরে বেড়ায়, সেখানেও ঢুকে পড়ছেন দর্শনার্থীরা। কেউ গরুর সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। এতে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইউপি সদস্য শহিদুল বলেন, দর্শনার্থী বাড়ায় গরু-বাছুরের চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া লোকজন যেখানে–সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় পরিবেশের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

অস্থায়ী দোকানপাট। বৃহস্পতিবার বিকেলে পদ্মার মিডিল চরে

দর্শনার্থীদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা

মিডিল চরের আকর্ষণ শুধু মাঠ ও নদীর দৃশ্য নয়। এখানকার মানুষের জীবনযাপনও দর্শনার্থীদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনই চরবাসীর প্রধান জীবিকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, চরে গরু-ছাগলের সংখ্যা আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার। গম, মসুর, খেসারি, ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। পাটের আবাদ শেষ হওয়ায় এখন অনেকেই পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। চরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০। তাঁদের জীবন এখনো অনেকটাই কৃষিনির্ভর।

মিডিল চরে এখন বসবাস করছেন মো. রফিকুল। তিনি বলেন, তাঁর আগের বসতি খিদিরপুর নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। আগে এই চরে বাইরের মানুষের দেখা মিলত না। এখন প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসছেন। তবে দর্শনার্থীর এই ভিড় যেন চরটির স্বাভাবিক জীবন ও পরিবেশ নষ্ট না করে, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

নিচু জায়গায় জমা পানিতে নেমেছেন কয়েকজন দর্শনার্থী। বৃহস্পতিবার দুপুরে পদ্মার মিডিল চরে

নিরাপত্তায় লাইফ জ্যাকেট

মিডিল চরে যেতে হয় নৌকায়। পদ্মার স্রোত বাড়লে নৌযাত্রায় ঝুঁকিও বাড়ে। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার পর নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

নৌযাত্রা নিরাপদ করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় নৌকার মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের মালেক ডগার ঘাটে মাঝিদের হাতে এসব লাইফ জ্যাকেট তুলে দেওয়া হয়।

রাসিক সচিব সোহেল রানার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল এ কার্যক্রমে অংশ নেয়। এ সময় নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা ও যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে মাঝিদের সচেতন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল আলমসহ কর্মকর্তারা।