ট্রাক থেকে নামানোর পর আমের নিলাম চলছে। খুচরা ক্রেতারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন। গতকাল দুপুর একটায় চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী ফলমন্ডিতে
ট্রাক থেকে নামানোর পর আমের নিলাম চলছে। খুচরা ক্রেতারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন। গতকাল দুপুর একটায়  চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী ফলমন্ডিতে

বাজারে আসছে ট্রাকভর্তি আম, হিমসাগর, ল্যাংড়া, রুপালি —কোনটির কেমন দাম

ঈদের ছুটি শেষ। খুলেছে সরকারি-বেসরকারি অফিস। নগরজীবন ফিরছে পুরোনো ছন্দে। সেই ছন্দ ফিরতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের ফলের বাজারেও। নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে গিয়ে দেখা গেল চিরচেনা ব্যস্ততা। একের পর এক ট্রাক ঢুকছে আড়তে। ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে আমভর্তি ক্রেট। শ্রমিকেরা মাথায় করে সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন দোকানের সামনে। কোথাও চলছে বাছাই। কোথাও দরদাম। আবার কোনো আড়তে চলছে নিলাম। চারদিকে আমের মিষ্টি গন্ধ।

ফলমন্ডির ভেতরে মেসার্স আল্লার দয়া স্টোরের সামনে তখন ছোটখাটো ভিড়। একদল খুচরা ব্যবসায়ী দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সামনে হিমসাগর আমের নিলাম চলছে। একজন বললেন ৫০ টাকা। আরেকজন ৫১। এরপর ৫২, ৫৩, ৫৪। শেষ পর্যন্ত কেজিপ্রতি ৫৬ টাকায় থামে দর। এরপর আম তুলে নেন এক খুচরা বিক্রেতা।

ঈদের ছুটির পর চট্টগ্রামের কদমতলীর পাইকারি ফল বিক্রির আড়ত ফলমন্ডিতে এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। দেশের নানা স্থান থেকে ট্রাক ভর্তি আম আসতে শুরু করেছে। কয়েকজন শ্রমিক ক্যারেট ভর্তি আম নামাচ্ছেন ট্রাক থেকে। গতকাল দুপুর একটায়

আড়তের কর্ণধার শাহ আলম বললেন, ঈদের ছুটির পর পুরোদমে আমের বেচাকেনা শুরু হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। আর সরবরাহ বাড়ার প্রভাব পড়েছে দামে।

শাহ আলম বলেন, ঈদের আগে ভালো মানের হিমসাগর ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এখন একই আম ৫৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে আম বেশি আসছে। তাই দামও কমছে।

খুচরা বাজারে হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। ঈদের আগে এর দাম ছিল আরও ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। ল্যাংড়া ও রুপালিও বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। এর বাইরে খুচরা বাজারে গোবিন্দভোগ, ক্ষীরশাপাতি ও গোপালভোগ আমও পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, ক্ষীরশাপাতি ও গোপালভোগের মিষ্টি স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে অনেক ক্রেতা এগুলো খুঁজছেন। খুচরা বাজারে এই আমের দাম পড়ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।

শাহ আলম জানান, বর্তমানে রাজশাহী, নাটোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম আসছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিন এক থেকে দুই ট্রাক আম এলেও ঈদের পর সেই সরবরাহ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিটি ট্রাকে থাকে প্রায় ৫০০ ক্রেট আম। প্রতি ক্রেটে গড়ে ২৫ কেজি। অর্থাৎ একটি ট্রাকে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কেজি আম আসে।

বাংলাদেশে আমের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা ও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন জেলা। চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই এসব অঞ্চলে সরাসরি বাগান কিনে আম সংগ্রহ করেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, মে মাসে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি ও হিমসাগরের মৌসুম শুরু হয়। জুনজুড়ে বাজারে আসবে আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙা, বারি-৪, আশ্বিনা ও রুপালি। ফলে সামনে বাজারে আমের বৈচিত্র্য আরও বাড়বে।

হিমসাগর, রুপালি, বানানা ম্যাঙ্গো, ল্যাংড়াসহ নানা জাতের আম সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফলের দোকানগুলোতে। গতকাল দুপুর একটায় চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী ফলমন্ডিতে

কোন আমের দাম কত

ফলমন্ডির পাইকারি বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে হিমসাগর। প্রতি কেজির দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এরপর রয়েছে ল্যাংড়া। এ আমও বিক্রি হচ্ছে একই দামে। বারি-৪ পাওয়া যাচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। রুপালির দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। কাটিমন ৭০ থেকে ৯০ টাকা। ব্যানানা ম্যাঙ্গো ৭০ থেকে ৯০ টাকা। সূর্য ডিম বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি।

মেসার্স সায়েম অ্যান্ড সাইফা এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা গেল, তাকজুড়ে সাজানো হিমসাগর, ল্যাংড়া ও রুপালি। তিনজন কর্মচারী ব্যস্ত আম ওজন করা আর ক্রেট গুছিয়ে রাখতে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ সুমন বলেন, ঈদের আগে বাজারে আম কম ছিল। এখন সরবরাহ বেড়েছে। দামও কিছুটা নেমেছে। সামনে আরও কমার সম্ভাবনা আছে।

শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, খুচরা বিক্রেতারাও এখন ফলমন্ডিমুখী। চকবাজারের ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন পাঁচ ক্রেট হিমসাগর কিনেছেন। প্রতি কেজি পড়েছে ৫৫ টাকা। তিনি বলেন, ঈদের পর থেকেই ক্রেতারা আম খুঁজছেন। বিশেষ করে হিমসাগর। মিষ্টি আর রসালো হওয়ায় এ আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

শুধু আম আর আম। ক্যারেট ভর্তি আম নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় একজন বিক্রেতা। গতকাল দুপুর একটায় চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী ফলমন্ডিতে

ক্রেতারাও বাজারে দাম কমার প্রভাব টের পাচ্ছেন। চকবাজারে আম কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের আগে যে হিমসাগর ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় কিনেছেন, এখন একই মানের আম ১০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। তাই পরিবারের জন্য এবার একটু বেশি করেই কিনছেন।

খুচরা বাজারে হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। ঈদের আগে এর দাম ছিল আরও ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। ল্যাংড়া ও রুপালিও বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এর বাইরে খুচরা বাজারে গোবিন্দভোগ, ক্ষীরশাপাতি ও গোপালভোগ আমও পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, ক্ষীরশাপাতি ও গোপালভোগের মিষ্টি স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে অনেক ক্রেতা এগুলো খুঁজছেন। খুচরা বাজারে এই আমের দাম পড়ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, আগামী দুই সপ্তাহে বাজারে আরও বেশি আম আসবে। তখন ক্রেতারা আরও বেশি জাতের আম পাবেন। সরবরাহ বাড়লে দামও আরও কিছুটা কমবে। মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, আমের মৌসুম এখনো শুরু পর্যায়ে। জমজমাট বাজার দেখা যাবে আরও সপ্তাহখানেক পর। তখন চট্টগ্রামের বাজারে থাকবে দেশের প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম।