অর্ধশত বছরের একটি পুরোনো সরকারি রাস্তার ইট তুলে মাটি কেটে জায়গা দখলে নিলেন সাইদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। সাইদুর একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে এই জমি দখলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার পাচলিয়া গ্রামে ওই ঘটনা ঘটে।
রাস্তাটি ওই এলাকার মানুষের ফসলের মাঠে যাওয়ার একমাত্র ব্যবস্থা ছিল। এ ঘটনায় সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন স্থানীয় দোড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. দবির উদ্দীন।
সাইদুর উপজেলার পাচলিয়া গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে তিনি বিএনপির নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সেই প্রভাব খাটিয়ে তিনি রাস্তা দখল করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। তবে দোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, সাইদুর বর্তমানে বিএনপির কেউ নন। তিনি রাস্তা দখলের যে অপকর্ম করেছেন, তার দায় বিএনপি নেবে না। তাঁরা দলের বদনাম করার জন্য এসব পরিচয় দিচ্ছেন।
আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিন পাচলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা পাশের লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে গেছে। ওই রাস্তার বটতলা নামক স্থান থেকে উত্তরে ফসলের মাঠ অভিমুখে একটি ইটের সলিংয়ের রাস্তা বেরিয়ে গেছে। আনুমানিক ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সরকারি ওই রাস্তাটি রাইয়ান জৈব কৃষি প্রকল্পের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রাস্তার উত্তর সীমান্তের আনুমানিক ৩০ ফুট জায়গার অর্ধেক অংশের ইট তুলে ফেলা হয়েছে। সেখানে মাটি কেটে বড় গর্তের সৃষ্টি করা হয়েছে।
রাইয়ান জৈব কৃষি খামারের মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁর বাড়ি শিবনগর গ্রামে। ২০১৮ সালে তিনি পাচলিয়া গ্রামের মাঠে ডোবা ও পরিত্যক্ত সাড়ে তিন একর জমি কেনেন। ২০২১ সালে সেখানে ঝিনুকে মুক্তা চাষের প্রকল্প গড়ে তোলেন, যার নাম দেন রাইয়ান পার্ল হারবার। এ ছাড়া সেখানে মাশরুম, মাছ চাষসহ নানা ফলের গাছের চাষ শুরু করেন। এই খামার শুরুর অনেক আগে থেকে পাচলিয়া গ্রামে বটতলা হতে ফসলের মাঠের এই রাস্তাটি বিদ্যমান। তিনি খামার করার তিন বছর পর স্থানীয় দোড়া ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে রাস্তাটি ইটের সলিং বিছিয়ে পাকা করা হয়। এ রাস্তা দিয়ে গ্রামের মানুষ মাঠের ফসল ঘরে তোলেন।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, গত ২০ এপ্রিল তিনি খামারে প্রবেশের সময় দেখতে পান রাস্তার পাশের জমির মালিক সাইদুর রহমান ওই রাস্তার ইট তুলছেন। পরে তিনি তাঁর জমির পাশের ওই রাস্তার প্রায় অর্ধেক অংশের মাটি কেটে পিলার গেড়ে তারকাঁটার বেড়া দেন। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর (সাইদুর) কাছে জানতে চাইলে তিনি জায়গাটি নিজের বলে দাবি করেন। পরে সরকারি কর্মকর্তাদের জানালে কোটচাঁদপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেল রানা সরেজমিনে আসেন। তিনি সরকারি রাস্তায় বেড়া দেওয়া দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে লোকজন লাগিয়ে বেড়া উঠিয়ে দেন। এ ঘটনার দেড় মাস পর ৫ জুন সকালে সাইদুর রাস্তার জায়গা দখলে নিতে মাটি কেটে গর্ত খুঁড়ে তাঁর জমির সঙ্গে মিশিয়ে নেন।
এ ঘটনায় গত রোববার দোড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. দবির উদ্দীন বাদী হয়ে সাইদুরের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা করেন।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, জায়গাটি ২ নম্বর খতিয়ানের ৩২৩ দাগে কাঁচা রাস্তা। যার রেকর্ডীয় মালিক দোড়া ইউনিয়ন পরিষদ। রাস্তাটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে কাজের বিনিময়ে টাকা প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সলিং করা হয়। সাইদুর রাস্তার ইট তুলে-মাটি কেটে দখল করেছেন, যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
এ বিষয়ে সাইদুর রহমান বলেন, রাস্তার অর্ধেক অংশ তাঁর জমির ওপর ছিল। কিন্তু স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জলিল জোর করে তাঁর জায়গার ওপর দিয়ে ইট বিছিয়ে সলিং রাস্তা তৈরি করেন। এ বিষয়ে তিনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। না পেয়ে শেষে তিনি নিজেই ব্যবস্থা নিয়েছেন।
এ বিষয়ে দোড়া ইউপি চেয়ারম্যান জলিল বলেন, এটি অনেক পুরোনো একটি সরকারি রাস্তা। এর আগে মাটির রাস্তা ছিল। এলাকার লোকজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাস্তাটিতে ইটের সলিং করা হয়। সাইদুর ওই রাস্তার ইট তুলে ঠিক করেননি। এ বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখছেন।
কোটচাঁদপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেল রানা বলেন, রাস্তাটি ইউনিয়ন পরিষদের। সাধারণ মানুষের চলাচলে এটা ব্যবহৃত হয়। একজন এটা দখল করার চেষ্টা করছে। প্রথমে বেড়া দিলে সেটা সরিয়ে দেওয়া হয়, পরে মাটি কেটে পাশের জমির সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে মামলা দেওয়া হয়েছে।