
ঢাকার সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের চাকুলিয়া গ্রামে সুফি সাধক কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের বাড়ি ও মাজারে দুই দিনব্যাপী ওরস বন্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আগামীকাল বুধবার ওরস শুরু হওয়ার কথা।
তবে এ ওরস বন্ধের দাবিতে গত রোববার সাভার উপজেলা প্রশাসন ও থানায় তৌহিদি জনতার পক্ষ থেকে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় পীর (ধর্মীয় নেতা), স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী পরিচয়ে ১০ জনের সই আছে।
ওরসের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর তৌহিদি জনতার নাম দিয়ে সুফি সাধক কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের বাড়ি ও মাজারে হামলা, মারধর, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর করা হয়। ওই ঘটনায় পরে কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের ভাই কাজী গোলাম রসুল বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলার আসামিসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরকে বিভিন্ন সময়ে মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে ওরস বন্ধের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরা।
যে ইউটিউব চ্যানেলে আমার মানহানি করা হয়েছে, সেই একই চ্যানেলে বক্তব্যটি রাগের বশে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং যে ইমাম ঘটনার জন্য দায়ী, সেই ইমামকে অপসারণ করতে হবে। তাঁরা এসব শর্তে রাজি হননি। এখন তাঁরা মিথ্যা অভিযোগ তুলে ওরস বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। হুমকি দিচ্ছেন।কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীর, সুফি সাধক
সুফি সাধক কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীর জানান, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হামলার পর ৪ অক্টোবর চাকুলিয়া বড় পঞ্চায়ত জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সাইদুর রহমান তাঁদের বিরুদ্ধে মারধরসহ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনা হয়েছে এমন মিথ্যা অভিযোগ তুলে মামলা করেন। একই দিন তাঁরাও প্রকৃত ঘটনা উল্লেখ করে মামলা করেন। পুলিশ তদন্ত করে হামলাকারীদের পক্ষে মিথ্যা প্রতিবেদন দেয়। পরে আদালতে নারাজি দিলে বিচারক পিবিআইকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের প্রতিবেদন দেওয়ার পর ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা বুঝতে পারেন মামলায় ওদের সাজা হবে।
কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালে চাকুলিয়া বড় পঞ্চায়ত মসজিদে বসে মাজারে হামলা এবং আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহেল (সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল) গত ১১ জুলাই ১৮-২০ জন লোক নিয়ে বিষয়টি আপসের জন্য আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমরা তিনটি শর্ত দিই। এগুলো হলো যে ইউটিউব চ্যানেলে আমার মানহানি করা হয়েছে, সেই একই চ্যানেলে বক্তব্যটি রাগের বশে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং যে ইমাম ঘটনার জন্য দায়ী, সেই ইমামকে অপসারণ করতে হবে। তাঁরা এসব শর্তে রাজি হননি। এখন তাঁরা মিথ্যা অভিযোগ তুলে ওরস বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। হুমকি দিচ্ছেন।’
যে যাঁর ধর্ম নিয়ে থাকবেন, এতে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু এভাবে ওনার (কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীর) কাছে যাঁরা আসেন, তাঁদের সামনে বা অন্যদের কাছে এ ধরনের বক্তব্য প্রচার করা হলে সহজমনা মানুষ যাঁরা আছেন, তাঁরা তো বিভ্রান্ত হয়ে যাবেন। ওরসের মধ্যেও উনি এগুলোই বলেন। পুলিশ প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছে এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।আমিনুল ইসলাম কাসেমী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক
ওরস বন্ধের স্মারকলিপিতে চাকুলিয়ার পীর (ধর্মীয় নেতা) মাওলানা তৈয়বুর রহমান খান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তরের আমির মাওলানা আলী আকবর কাসেমী, মহাসচিব মাওলানা আলী আজম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা শাখার সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব, সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহা. আবুল খায়ের ব্যাপারী, সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী আমিনুল ইসলাম আমিন স্বাক্ষর করেছেন।
হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম কাসেমী প্রথম আলোকে বলেন, “ওনার (কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীর) ওয়াজের ভিডিওতে বলেছেন, ‘নামাজ পড়লে জান্নাতে যাওয়া যাবে, এটা কোথায় আছে? আল্লাহ, রসুল এবং মুর্শিদ একই জিনিস।’ তিনি ইসলামের অপব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় সেন্টিমেন্টে আঘাত হানে– এ ধরনের বক্তব্য দেন। যে যাঁর ধর্ম নিয়ে থাকবেন, এতে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু এভাবে ওনার কাছে যাঁরা আসেন, তাঁদের সামনে বা অন্যদের কাছে এ ধরনের বক্তব্য প্রচার করা হলে সহজমনা মানুষ যাঁরা আছেন, তাঁরা তো বিভ্রান্ত হয়ে যাবেন। ওরসের মধ্যেও উনি এগুলোই বলেন। পুলিশ প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছে এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।’
এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে আইনশৃঙ্খলার যেন অবনতি না হয়, সেটাই চেয়েছেন বলে জানান সাভার থানা বিএনপির বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘উভয় পক্ষ যখন একে অপরকে দোষারোপ করছে, তখন উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়ে আইনিভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি। ওরসের বিষয়টি প্রশাসন দেখবে। আমার উদ্দেশ্য এলাকায় যেন স্থীতিশীল পরিবেশ বজায় থাকে।’
সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল আরও বলেন, ‘একবার আপসের চেষ্টা করেছিলাম। তবে কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত দেওয়া হয়। সেই শর্তগুলোর বিষয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। তবে তাঁরা শর্ত মানতে রাজি হননি। এর ফলে আপসের মধ্য দিয়ে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান করা সম্ভব হয়নি।’
নিরাপত্তার দাবি
এদিকে বিভিন্ন সময়ে হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ২০ আগস্ট সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন কাজী জাবের আল-জাহাঙ্গীরের ভাই কাজী গোলাম রসুল। এ ছাড়া ওরস নির্বিঘ্নে পালন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সাভার মডেল থানাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরেজমিনে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, উভয় পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে। ওরস আয়োজকদের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অপর পক্ষকে মব কালচার থেকে বের হয়ে একে অন্যের প্রতি সহানুভূতি এবং আইন মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে। আইন যাঁরাই অমান্য করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওরস বন্ধের জন্য একটি পক্ষ স্মারকলিপি দিয়েছিল এবং অপর পক্ষ অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছিল। আমরা দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছি। নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার সবারই রয়েছে। ঘরের ভেতরে বা ইনডোরে ওরস আয়োজনে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। তবে ওরসে উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার বা কোনো অসামাজিক কাজ করা যাবে না—এমন কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওরসে বহিরাগত দর্শনার্থীদের যেন কোনো ধরনের বিরক্ত না করা হয়, সে বিষয়েও স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে।’