বরিশালের উজিরপুর

লাল শাপলার বিলে বদলে গেছে সাতলার অর্থনীতি

ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে লাল শাপলার পাপড়িতে। টলটলে পানির ওপর সারি সারি লাল শাপলা উঁকি দিচ্ছে সূর্যের দিকে। তার ফাঁক দিয়ে ধীরে এগিয়ে যায় ছোট ছোট পর্যটকবাহী নৌকা। বইঠার প্রতিটি টানে দুলছে ফুল, পানিতে তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ঢেউ। পাখির কিচিরমিচির, কোথাও মাছের খোঁজে পানকৌড়ির ডুব, আবার কোথাও মাছরাঙার সতর্ক দৃষ্টি। ৬ সেপ্টেম্বর সাতলার বিলের এমন দৃশ্য বিমোহিত করেছে পর্যটকদের।

বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নে সাতলা বিল। লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত সাতলা বিলের প্রকৃত আয়তন প্রায় ২০০ একর। তবে বর্ষার মৌসুমে আশপাশের গ্রাম, প্লাবনভূমিসহ প্রায় ১০ হাজার একর বিস্তীর্ণ জলাভূমি শাপলার চাদরে ঢেকে যায়।

সারা বছরই সাতলার বিলে পানি থাকে। তবে বর্ষায় যেন তার প্রাণ ফিরে আসে। আর শরতে সেই প্রাণের সৌন্দর্য বিকশিত হয় লাল শাপলার সাম্রাজ্যে। ছোট ছোট নৌকায় পর্যটকেরা ঘুরে ঘুরে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন এই সৌন্দর্য। কিন্তু একই বিলের আরেকটি গল্প আছে। সেই গল্প জীবিকার। মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের।

নৌকার বইঠা হাতে যিনি পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন, তাঁর কাছে এটি মৌসুমি আয়ের উৎস। বিলের পানিতে নেমে শাপলা সংগ্রহ করা নারীটির কাছে এই ফুল সংসারের বাজার খরচের টাকা। বিলের পাশের খাবারের দোকানির কাছে পর্যটক মানে বাড়তি বিক্রি। আর অটোরিকশাচালকদের কাছে বাড়তি যাত্রী। ফলে লাল শাপলার বিলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি বদলে গেছে সাতলা গ্রামের অর্থনীতি।

বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে শাপলা

সাতলা বিল মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমি। বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই থেকে ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে দেখা যায় শাপলার আধিপত্য। লালের পাশাপাশি রয়েছে সাদা ও বেগুনি শাপলাও। তবে তা সংখ্যায় সীমিত। বিলের মাঝখানে থাকা বসতিগুলোর মানুষের জীবনও এই জলাভূমির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষায় চারপাশে পানি বাড়লে নৌকাই হয়ে ওঠে তাঁদের যাতায়াতের বাহন।

সাতলার এই বিস্তৃত জলাভূমি প্রাণ ও জীববৈচিত্র্যেরও অনন্য আধার। বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন পাখি ঘুরে বেড়ায় বিলের জলে ও আশপাশে। এই প্রাকৃতিক পরিবেশই এখন পর্যটনের মূল আকর্ষণ। ঢাকা থেকে সাতলা বিলের সৌন্দর্য দেখতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা রিয়াদ হাসান। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই সাতলা বিলের শাপলার সৌন্দর্যের কথা শুনছি, ছবিও দেখেছি; কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে আসা হয়নি। এবার এসে দেখলাম, ছবিতে যতটা সুন্দর মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।’

সাতলা বিলে ফুটেছে লাল শাপলা। চোখজুড়ানো সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকেরা। গত রোববার সকালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিলে

শাপলা ফোটার মৌসুমে সাতলায় পর্যটকের আনাগোনা বাড়তে থাকে। স্থানীয় নৌকার মাঝিদের হিসাবে, প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ বিল দেখতে আসেন। শুক্র ও শনিবার এই সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়। চারটি স্পটে পর্যটকদের নিয়ে চলে অর্ধশতাধিক নৌকা।

চয়ন হাওলাদার (৩৫) নৌকায় করে পর্যটকদের বিল ঘুরিয়ে দেখান। তিনি বলেন, শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসেন। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির ব্যবসাও বাড়ে। স্থানীয় মাঝিদের হিসাবে, এসব নৌকা থেকে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা আয় হয়; অর্থাৎ যে বিল একসময় স্থানীয় মানুষের কাছে ছিল মূলত জলাভূমি ও জীবিকার জায়গা, সেখানে এখন পর্যটনের কারণে তৈরি হয়েছে আলাদা অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য। স্থানীয় মাঝি ইদ্রিস আলী ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন, সবুজ ঘরামী ও লিয়াকত আলীও পর্যটন মৌসুমকে বাড়তি আয়ের সময় হিসেবে দেখছেন।

বিলের জলে জীবিকা

সাতলার অর্থনীতির সবচেয়ে নীরব অংশটি নৌকা থেকে দেখা যায় না। ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিলের পানিতে নামেন গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা দাস। পানির গভীরতা কখনো বুক ছাড়িয়ে যায়। তবু শাপলা তুলতে তাঁদের নামতে হয়। কারণ, তাঁদের কাছে শাপলা সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এটি সংসারের উপার্জনের অবলম্বন।

গীতা রানী দাস বলেন, মা-মেয়ে মিলে বিকেলে বিলের পানিতে নেমে শাপলা তোলেন। পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো পাঁচ টাকা দরে শাপলা বিক্রি করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করেই তাঁদের সংসার চলে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলা বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য যাতে বিলের পানিতে না ফেলা হয়, সে জন্য প্রতিটি নৌকায় একটি করে বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে।
মো. আলী সুজা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উজিরপুর

শাপলা সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় শতাধিক পরিবার। দিনভর বিল থেকে সংগ্রহ করা শাপলা চলে যায় পাইকারদের কাছে। এরপর উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ ও বরিশাল শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হয়। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া—এমনকি রাজধানীর বাজারেও পৌঁছে যায় সাতলার শাপলা। পাইকারি শাপলা বিক্রেতা দীনেশ ঠাকুর বলেন, তাঁরা বিলের শাপলা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে সরাসরি শাপলা কিনে বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন।

প্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আবদুর রহিমের অভিযোগ, পর্যটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করতে আসা মানুষের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্য ইতিমধ্যে বিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে বিলটি গুছিয়ে তোলা যায়, সেটি ভাবার সময় এখনই।

পরিবেশবাদীরাও একই ধরনের সতর্কতার কথা বলছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, সাতলার শাপলা বিলকে মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি বিলে প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যাতে না ফেলা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সাতলা বিল থেকে শাপলা তুলে ভ্যানে করে বিক্রি করছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। গত রোববার সকালে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিল এলাকায়

বাড়ছে পর্যটনের সম্ভাবনা

শাপলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন মানুষেরাও পর্যটন থেকে আয় করছেন। বিলের আশপাশে খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল পর্যটন মৌসুমে বেড়ে যায়। একজন স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, পর্যটকের ভিড় বাড়লে তাঁদের খাবারের বিক্রিও বাড়ে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন। এতে স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়।

স্থানীয় প্রবীণ আবদুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখছেন। তখন মানুষ তেমন আসতেন না। এখন শাপলা ফোটার মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসেন।

সাতলার পরিবর্তনটা এখানেই। আগে বিল ছিল জীবিকার জায়গা। এখন সেই জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় সাতলা বিলকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

গত বছর ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ‘ভিউ পয়েন্ট’ (পর্যটকদের বসার ও ছবি তোলার জায়গা) তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে।

উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৫ লাখ টাকা এবং চলতি বছর আরও ৫ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়িতে দুটি ‘ভিউ পয়েন্ট’ (পর্যটকদের বসার ও ছবি তোলার জায়গা) তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলা বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য যাতে বিলের পানিতে না ফেলা হয়, সে জন্য প্রতিটি নৌকায় একটি করে বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসনের একাধিক মনিটরিং টিম কাজ করছে।