ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় কাটার জন্য বিচিং করা জাহাজ। গতকাল দুপুরে তোলা
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় কাটার জন্য বিচিং করা জাহাজ। গতকাল দুপুরে তোলা

প্রথম আলো এক্সপ্লেইনার

জাহাজ কেন ভাঙা হয়, বাংলাদেশ কেন জাহাজভাঙা শিল্পের বড় কেন্দ্র

একটি জাহাজ বছরের পর বছর সমুদ্রে চলে। পণ্য, তেল কিংবা গ্যাস বহন করে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরামত ও পরিচালনার খরচ বাড়তে থাকে। একসময় জাহাজটি আর চালানো লাভজনক থাকে না। তখন সেটি বিক্রি হয় ভাঙার জন্য।

সেখান থেকেই শুরু হয় জাহাজটির শেষ যাত্রা। হাজার হাজার টন ওজনের জাহাজটি ধীরে ধীরে টুকরা করা হয়। আলাদা হয় ইস্পাত, ইঞ্জিন, জেনারেটর, পাম্প, পাইপ, তার, তামা, পিতল ও আসবাব। এর প্রায় সবকিছুই আবার কোনো না কোনোভাবে ব্যবহারে ফিরে আসে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা বা আইএমও বলছে, সঠিকভাবে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা গেলে এর প্রায় সব উপকরণই আবার কাজে লাগানো সম্ভব। পুরোনো জাহাজের ইস্পাত গলিয়ে আবার ব্যবহার করলে শক্তিরও সাশ্রয় হয়। লোহার আকরিকসহ কাঁচামাল থেকে নতুন ইস্পাত তৈরিতে যে শক্তি লাগে, পুনর্ব্যবহৃত ইস্পাত থেকে তৈরিতে লাগে তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

কিন্তু জাহাজভাঙার কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েক টন ওজনের ইস্পাত কাটা হয়। ক্রেন ও তার দিয়ে সেগুলো নামানো হয়। শ্রমিকদের উঁচু জায়গায় কাজ করতে হয়। আগুন ব্যবহার করে লোহা কাটতে হয়। আবার জাহাজের ট্যাংক ও আবদ্ধ জায়গায় থাকতে পারে বিষাক্ত কিংবা দাহ্য গ্যাস। সেই ঝুঁকির বিষয়টিই নতুন করে সামনে এসেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে।

গতকাল শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে একটি পুরোনো জাহাজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। একসঙ্গে ৯ জনের মৃত্যু কিছু পুরোনো প্রশ্নও সামনে এনেছে। একটি জাহাজ আসলে কীভাবে ভাঙা হয়? কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি? কেন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে বড় জাহাজভাঙার ব্যবসা দক্ষিণ এশিয়ায় চলে এল? বাংলাদেশ কেন এই বাজারের বড় কেন্দ্র? ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ মানে কী? এত আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়ম থাকার পরও শ্রমিকের মৃত্যু কেন থামছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখতে হবে এই শিল্পের ইতিহাস ও অর্থনীতি।

শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে একটি পুরোনো জাহাজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। একসঙ্গে ৯ জনের মৃত্যু কিছু পুরোনো প্রশ্নও সামনে এনেছে। একটি জাহাজ আসলে কীভাবে ভাঙা হয়? কোথায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি? কেন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে বড় জাহাজ ভাঙার ব্যবসা দক্ষিণ এশিয়ায় চলে এল? বাংলাদেশ কেন এই বাজারের বড় কেন্দ্র?

একসময় ভাঙা হতো উন্নত দেশে

জাহাজভাঙা বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প ছিল না। বিশ শতকের বড় একটি সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলোতেই পুরোনো জাহাজ ভাঙা হতো। পরে এর কেন্দ্র চলে যায় পূর্ব এশিয়ায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীন বিভিন্ন সময়ে জাহাজভাঙার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

আশির দশক থেকে সেই কেন্দ্র আবার বদলাতে থাকে। এবার পুরোনো বড় জাহাজ আসতে শুরু করে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সৈকতে। বিশ্বব্যাংকের ২০১০ সালের ‘দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড পাকিস্তান’—গবেষণায় এই স্থানান্তরের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জাহাজভাঙা অত্যন্ত শ্রমনির্ভর কাজ। কোথায় জাহাজভাঙা লাভজনক হবে, তার সঙ্গে শ্রমের দাম সরাসরি জড়িত। এর সঙ্গে আছে স্ক্র্যাপ ইস্পাতের স্থানীয় দাম, পরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা বিধি মানার খরচ।

দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রম তুলনামূলক সস্তা। স্ক্র্যাপ ইস্পাতের বড় বাজারও আছে। আবার দীর্ঘ সময় পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধির প্রয়োগ উন্নত দেশের তুলনায় দুর্বল ছিল। এসব কারণে এই অঞ্চলের ইয়ার্ডগুলো পুরোনো জাহাজের জন্য তুলনামূলক বেশি দাম দিতে পেরেছে।

ইউরোপে খরচ বেশি

একটি বড় জাহাজ নিরাপদে ভাঙতে দরকার প্রশিক্ষিত শ্রমিক, প্রকৌশলী ও তদারককারী। দরকার ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী। ক্রেন, হুক ও তার নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়। গ্যাস পরীক্ষা করতে হয়। বিপজ্জনক বর্জ্য আলাদা করতে হয়। বর্জ্য তেল, ভারী ধাতু এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক নিরাপদে সরানো ও নিষ্পত্তিরও খরচ আছে। ইউরোপীয় কমিশনের জন্য করা ২০০৭ সালের শিপ ডিসমেন্টালিং অ্যান্ড প্রি-ক্লিনিং অব শিপস প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাজারের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ইউরোপে বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ভাঙা অর্থনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। এর বড় কারণ শ্রমের খরচ। এর সঙ্গে যোগ হয় শ্রমিকের নিরাপত্তা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয়।

অর্থাৎ ইউরোপে একটি জাহাজ ভাঙতে যে খরচ হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহাসিকভাবে তা অনেক কম ছিল। এখানে পরিবেশগত খরচের প্রশ্নও আছে। নিরাপত্তা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের পুরো ব্যয় ব্যবসার খরচের মধ্যে না এলে তার একটি অংশ গিয়ে পড়ে শ্রমিকের স্বাস্থ্য, স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশের ওপর।

এক শ্রমিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতকাল সকালে তোলা

বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়

বিশ্বের বহু দেশে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে বড় বাণিজ্যিক জাহাজ ভাঙার বাজার কয়েকটি দেশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা বা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ৮০ শতাংশই হয়েছে ভারত, বাংলাদেশ ও তুরস্কে।

গ্রস টনেজের হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। আঙ্কটাডের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২৭ লাখ ৩৫ হাজার গ্রস টন জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়েছে। এটি বৈশ্বিক মোট পরিমাণের ৩২ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রায় ২৯ লাখ ৯৮ হাজার গ্রস টন নিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত।

বেলজিয়ামভিত্তিক এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের জাহাজভিত্তিক তালিকাতেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে ৩২১টি পুরোনো জাহাজ ভাঙা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে ৮৮টি। এসব জাহাজের মোট গ্রস টনেজ প্রায় ২৬ লাখ ৮২ হাজার। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে ৮৪টি নিবন্ধিত জাহাজভাঙা কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৩টি ‘গ্রিন ইয়ার্ড’।

আঙ্কটাডের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২৭ লাখ ৩৫ হাজার গ্রস টন জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়েছে। এটি বৈশ্বিক মোট পরিমাণের ৩২ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রায় ২৯ লাখ ৯৮ হাজার গ্রস টন নিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত।

আটকে পড়া জাহাজ দিয়ে শুরু

বাংলাদেশের জাহাজভাঙার শুরুটাও ঘটনাচক্রে। ১৯৬০ সালের এক প্রবল ঝড়ে গ্রিক কার্গো জাহাজ এম ডি আলপাইন ফৌজদারহাট উপকূলে আটকে পড়ে। সেটি আর সমুদ্রে ফেরানো যায়নি। ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম স্টিল হাউস জাহাজটি ভাঙার উদ্যোগ নেয়।

এরপর মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি জাহাজ আল আব্বাস উদ্ধার করা হয়। ১৯৭৪ সালে সেটি ভাঙা হয়। আশির দশকে শিল্পটি দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময় যুক্তরাজ্য, স্পেন, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বড় আকারের জাহাজভাঙা থেকে সরে যাচ্ছিল।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজভাঙা দেশে পরিণত হয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ২২২টি জাহাজ ভেঙেছিল। মোট ওজন ছিল প্রায় ২৪ লাখ লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টন বা এলডিটি। ওই বছর এলডিটির হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে ছিল।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৩৭ শ্রমিক মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয় ২০১৯ সালে। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় আরও তিন শ্রমিক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ২৫ জন।

কেন সীতাকুণ্ড

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের প্রায় পুরোটাই গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে। এরও কারণ আছে। প্রথম কারণ প্রকৃতি। সীতাকুণ্ডের সৈকত দীর্ঘ এবং ঢাল কম। বালু ও কাদার এই উপকূলে জোয়ার-ভাটার পার্থক্যও বড়। আইএমওর একটি গবেষণায় পানির উচ্চতার পার্থক্য ছয় মিটার পর্যন্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে উচ্চ জোয়ারে বড় জাহাজ সৈকতের অনেকটা ভেতরে তুলে আনা যায়।

দ্বিতীয় কারণ বাজার। জাহাজ থেকে পাওয়া ইস্পাতের বাংলাদেশে বড় চাহিদা রয়েছে। সীতাকুণ্ডের কাছেই গড়ে উঠেছে রিরোলিং মিল ও অন্য সহযোগী শিল্প। পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ফলে জাহাজ থেকে নামানো লোহা দ্রুত কারখানা ও বাজারে পাঠানো যায়।

তৃতীয় কারণ শ্রমব্যয়। তুলনামূলক সস্তা শ্রম, ইস্পাতের বড় স্থানীয় বাজার, রিরোলিং মিলের নৈকট্য এবং সহযোগী শিল্প-সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ড এই ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।

একটি জাহাজ যেভাবে ভাঙে

পুরোনো জাহাজের দাম নির্দিষ্ট নয়। জাহাজের ধরন, ওজন, বয়স এবং ভেতরে থাকা মূল্যবান উপকরণের ওপর দাম নির্ভর করে। বড় একটি পুরোনো জাহাজের দাম এক কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। জাহাজ কেনার পরই সেটি এনে কাটা যায় না। প্রথমে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের অনাপত্তি সনদ নিতে হয়। দেশে আসার পর জাহাজের বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা, গ্যাসমুক্ত অবস্থা এবং জাহাজভিত্তিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ পরিকল্পনা যাচাই করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্ফোরক অধিদপ্তরের গ্যাসমুক্ত সনদও নিতে হয়। সব অনুমতি শেষে উচ্চ জোয়ারের সময় জাহাজটি ইয়ার্ডের সৈকতে তুলে আনা হয়। এই পদ্ধতির নাম ‘বিচিং’।

তারপর জাহাজে তেল, গ্যাস ও বিপজ্জনক পদার্থ কোথায় আছে, তা পরীক্ষা করতে হয়। কোথায় মানুষ নিরাপদে ঢুকতে পারবেন, তা নিশ্চিত করতে হয়। যে জায়গায় আগুন দিয়ে লোহা কাটা হবে, সেটি ‘হট ওয়ার্ক’-এর জন্য নিরাপদ কি না, তা–ও যাচাই করতে হয়। ট্যাংক ও চেম্বার পরিষ্কার করতে হয়। ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, লুব্রিকেটিং অয়েল ও স্লাজ আলাদা করতে হয়।

এরপর শুরু হয় মূল কাটিং। জাহাজের ওপরের কাঠামো থেকে ধাপে ধাপে ইস্পাত কাটা হয়। গ্যাস কাটার কিংবা স্বয়ংক্রিয় কাটার দিয়ে বড় বড় অংশ আলাদা করা হয়। বড় অংশ ভারী যন্ত্র দিয়ে তীরে আনা হয়। এরপর সেগুলো আবার ছোট করে কাটা হয়। ইস্পাত চলে যায় স্টিল বা রিরোলিং মিলে। ইঞ্জিন, পাম্প, মোটর, পাইপ কিংবা অন্য ব্যবহারযোগ্য জিনিস যায় আলাদা বাজারে।

কত দিন লাগে

একটি জাহাজ ভাঙতে নির্দিষ্ট সময় নেই। জাহাজ কত বড়, কী ধরনের, ইয়ার্ডে কত শ্রমিক আছেন এবং কী প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে—এসবের ওপর সময় নির্ভর করে। বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের আর্থিক প্রবাহ নিয়ে করা একটি গবেষণায় গড় আকারের একটি জাহাজ পুরোপুরি ভাঙতে প্রায় ১৮০ দিন বা ছয় মাস লাগার হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে ছোট জাহাজে সময় কম লাগতে পারে। বড় ও জটিল জাহাজে বেশি সময়ও লাগতে পারে।

জাহাজের ভেতরে কী থাকে

এটি অনেকটা ভাসমান শিল্পকারখানার মতো। জাহাজে যেমন বড় রান্নাঘর থাকে, তেমনি থাকে নাবিকদের থাকার কক্ষ, চিকিৎসার সরঞ্জাম, অফিস ও স্টেশনারি সামগ্রী। জাহাজ চালানোর জন্য থাকে বড় ইঞ্জিন, জেনারেটর, পাম্প, মোটর, পাইপ, ভাল্‌ভ, বৈদ্যুতিক তারসহ অসংখ্য যন্ত্রপাতি। আলপিন থেকে নাটবল্টু, রান্নাঘরের তৈজসপত্র থেকে শিল্পকারখানার কাঁচামাল-পুরোনো জাহাজে পাওয়া যায় হাজারো পণ্য। থাকে এয়ারকন্ডিশনার, বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, সাউন্ডবক্স, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, আসবাব ও ব্যায়ামের সরঞ্জামও। এসবের বড় অংশ আবার ব্যবহার করা যায়।

সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ইস্পাত। জাহাজের কাঠামোর প্রায় পুরোটাই ইস্পাতের। ভাঙার পর এই ইস্পাতের বড় অংশ রিরোলিং মিলের কাঁচামাল হিসেবে যায়। তামা, পিতল ও মরিচারোধী ইস্পাতের সরঞ্জামেরও আলাদা বাজার রয়েছে। জাহাজের মূল্যবান অংশগুলোর একটি প্রপেলার। বড় জাহাজের একটি প্রপেলারের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

নিহত এক শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারি। গতকাল সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে

জাহাজ ভাঙার পর ব্যবহারযোগ্য পণ্য সাধারণত নিলামে বিক্রি হয়। সেখান থেকে ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে এসব পণ্য পৌঁছে যায় বাজারে। চট্টগ্রামের বাঁশবাড়িয়া থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে জাহাজভাঙা পণ্যের বহু দোকান রয়েছে। পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট, সাগরিকা, পশ্চিম মাদারবাড়ী, কদমতলী ও মুরাদপুরেও এসব পণ্য বিক্রি হয়। ঢাকার ধোলাইখাল ও সদরঘাটের বাজারেও যায় চট্টগ্রামে ভাঙা জাহাজের নানা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম।

তবে সবকিছুই যে ব্যবহারযোগ্য, তা নয়। জাহাজের ভেতরে বিপজ্জনক জিনিসও থাকে। অ্যাসবাস্টাস, ভারী ধাতু, হাইড্রোকার্বন এবং ওজোনস্তর ক্ষয়কারী পদার্থসহ নানা ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে পুরোনো জাহাজে। এ কারণেই একটি পুরোনো জাহাজ একই সঙ্গে সম্পদের ভান্ডার এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র।

কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৩৭ শ্রমিক মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয় ২০১৯ সালে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় আরও তিন শ্রমিক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ২৫ জন। তাঁদের ১০ জন গুরুতর এবং ১৫ জন মাঝারি ধরনের আঘাত পেয়েছেন। এর সঙ্গে সর্বশেষ নয়জনের মৃত্যু যোগ করলে ২০১৫ সালের শুরু থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১৪৯।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে বিলস দেখেছে, ভারী গার্ডার বা অন্য বস্তু পড়ে ৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ক্রেন, হুক ও তারের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্ঘটনা আটটি। আগুন ও দগ্ধ হওয়ার ঘটনা পাঁচটি। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ছিল। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কাটারম্যান, কাটার হেলপার, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান এবং মালামাল ওঠানো-নামানোর শ্রমিকেরা। বিলস দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আছে অনিরাপদ পদ্ধতিতে কাজ, ত্রুটিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি, দুর্বল তদারকি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব।

শ্রমিক, শ্রমিকনেতা, ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর অভিযোগ, অনেক ইয়ার্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী হেলমেট, গ্লাভস, নিরাপত্তা জুতা, চোখ ও মুখ রক্ষার সরঞ্জামসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পাওয়া যায় না। কোথাও সরঞ্জাম থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। ফলে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তবে গ্রিন ইয়ার্ডের শর্তে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী, প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব নিয়ম প্রতিদিনের কাজে কতটা মানা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও দেশের আইন

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো হলো হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস। ২০০৯ সালে গৃহীত কনভেনশনটি ২০২৫ সালের ২৬ জুন কার্যকর হয়। বাংলাদেশ এতে যোগ দেয় ২০২৩ সালের ২৬ জুন।

কনভেনশনের মূল লক্ষ্য শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাহাজ ভাঙার কারণে পরিবেশের ক্ষতি কমানো। এর আওতায় প্রতিটি জাহাজে বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা বা আইএইচএম থাকতে হয়। সেখানে জাহাজের কোথায় কী ধরনের বিপজ্জনক পদার্থ রয়েছে এবং আনুমানিক কতটা রয়েছে, তার তথ্য থাকে।

জাহাজভাঙার ইয়ার্ডকেও অনুমোদিত হতে হয়। প্রতিটি ইয়ার্ডের জন্য জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা পরিকল্পনা এবং প্রতিটি জাহাজের জন্য আলাদা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ পরিকল্পনা থাকতে হয়। কোন অংশ কীভাবে কাটা হবে, কোথায় কী ঝুঁকি আছে, শ্রমিকের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং বিপজ্জনক পদার্থ ও বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব বিষয় সেই পরিকল্পনায় থাকার কথা। বাংলাদেশে এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ এবং জাহাজভাঙা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০১১। কিন্তু সেসব আইন যথাযথভাবে মানা হয় না বলে অভিযোগ।

গ্রিন ইয়ার্ড হতে কী লাগে

দেশে এখন প্রায় ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ড রয়েছে। আরও কয়েকটি ইয়ার্ড সেই মানে রূপান্তরের কাজ করছে। বাংলাদেশে গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ দেয় বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড। সহজ করে বললে, শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্ধারিত মান মেনে যে ইয়ার্ড জাহাজ ভাঙতে পারে, সেটিই গ্রিন ইয়ার্ড।

এর জন্য ইয়ার্ডে বিশেষ অবকাঠামো থাকতে হয়। এমন মেঝে ও পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা দরকার, যাতে তেল বা ক্ষতিকর তরল মাটিতে মিশে না যায়। বিপজ্জনক বর্জ্য আলাদা করে নিরাপদে রাখার জায়গা থাকতে হয়। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকতে হয়। জরুরি উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হয়। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হয়।

শুধু অবকাঠামো থাকলেই অবশ্য গ্রিন মান পূরণ হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়। ট্যাংক বা আবদ্ধ জায়গায় ঢোকার আগে সেটি নিরাপদ কি না, পরীক্ষা করতে হয়। আগুন দিয়ে কাটার আগেও একই পরীক্ষা দরকার।

জাহাজের বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্ত করতে হয়। সেগুলো নিরাপদে আলাদা ও ব্যবস্থাপনা করতে হয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখতে হয়। তাই একটি ইয়ার্ডের কংক্রিটের মেঝে থাকতে পারে। আধুনিক যন্ত্রপাতিও থাকতে পারে। সনদও থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি ট্যাংকে ঢোকার আগে গ্যাস পরীক্ষা না হলে কিংবা কোনো ক্রেনের তার পরীক্ষা না হলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে।

শ্রমের ওপর দাঁড়ানো শিল্প

জাহাজভাঙা মূলত শ্রমনির্ভর শিল্প। আইএমওর ২০১৭ সালের অর্থনৈতিক গবেষণায় ২০১৫ সালে এই শিল্পে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার পূর্ণকালীন সমতুল্য কর্মসংস্থানের হিসাব করা হয়েছিল। এর বাইরে রিরোলিং মিল, পরিবহন, পুরোনো যন্ত্রপাতির ব্যবসা এবং অন্য সহযোগী খাতে আরও বহু মানুষের জীবিকা জড়িত।

বিএসআরবির বর্তমান হিসাবে সরাসরি ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ রয়েছে। এই শ্রমিকদের কেউ কয়েক টন ওজনের লোহার পাত কাটেন। কেউ ক্রেন ও তার সামলান। কেউ জাহাজের অনেক উঁচুতে উঠে কাজ করেন। আবার কাউকে ট্যাংক বা আবদ্ধ জায়গায় ঢুকতে হয়।

নিরাপত্তার পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মঘণ্টা নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত বা প্রাপ্য মজুরি পুরোপুরি দেওয়া হয় না। নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করানো হলেও ওভারটাইমের টাকা না পাওয়ার অভিযোগও আছে।

সাম্প্রতিক ফেরদৌস স্টিলের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অভিযোগ সরকারি পরিদর্শনে উঠে এসেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে নিরাপত্তা–সংক্রান্ত ঘাটতির পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করিয়ে ওভারটাইমের টাকা না দেওয়ার অভিযোগ পান। পরে নোটিশ দিয়েও যথাযথ জবাব না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।