রোপণ করা গাছের পাশে বৃক্ষপ্রেমী নুরুল হক। সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফতেয়াবাদ চৌধুরীহাট এলাকায়
রোপণ করা গাছের পাশে বৃক্ষপ্রেমী নুরুল হক। সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফতেয়াবাদ চৌধুরীহাট এলাকায়

সুযোগ পেলেই মানুষের জন্য গাছ লাগান বৃক্ষপ্রেমী নুরুল

হাটহাজারীর পাশাপাশি ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তিনি গাছ রোপণ ও বিতরণ করেছেন। কবরস্থান, খেলার মাঠের ধারে, স্কুলের মাঠ, পাহাড়ের পাদদেশ ও সড়কের দুই পাশসহ নানা স্থানে তাঁর লাগানো গাছ রয়েছে।

১০ বছর বয়স থেকেই টিফিনের টাকা জমিয়ে চারা কিনতেন তিনি। প্রথমে এসব চারা নিজের বাড়িতে লাগাতেন। এতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গাছ লাগানোর জায়গা শেষ হয় তাঁর। এরপর প্রতিবেশীদের চারা কিনে দেওয়া শুরু করেন। এভাবে একে একে পুরো গ্রাম, উপজেলাজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় চারা বিলিয়েছেন তিনি। এ কারণে এলাকাতেও পরিচিতি পেয়েছেন বৃক্ষপ্রেমী নামে।

বলছিলাম নুরুল হকের (৪২) কথা। তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের ফতেয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা। বাড়ির কাছেই আসবাবের দোকান রয়েছে তাঁর। এ দোকানের আয়ের একটি অংশ চারা কেনায় ব্যয় করেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে এসব চারা বিতরণও করেন।

অবশ্য শুধু বিতরণ নয়, গাছগুলো ঠিকভাবে রোপণ ও পরিচর্যা হচ্ছে কি না, তা–ও তদারকি করেন তিনি। গাছের উপকারিতা ও পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চালান নানা প্রচারণা। এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ফতেয়াবাদ বৃক্ষরোপণ সমবায় সমিতি’ নামের সংগঠনের। নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি এসব কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করেন। তাঁর দাবি, গত ৩০ বছরে প্রায় ১ লাখ চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন তিনি।

‘গাছ লাগানোর জন্য অনেকেই আমাকে ট্রল করেছেন, পাগল বলেছেন। এরপরও থামিনি। আমি চাই, প্রতিটি গ্রামে আমার মতো লোক তৈরি হোক।’
—নুরুল হক, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নূরুল হক এলাকায় বাবুল নামে পরিচিত। অনেকেই তাঁকে ‘বৃক্ষপ্রেমী বাবুল’ নামে ডাকেন। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে তিনি মানুষের সঙ্গে গাছ ও পরিবেশ নিয়ে কথা বলেন।

সম্প্রতি ফতেয়াবাদ এলাকার দোকানে গিয়ে কথা হয় নুরুলের সঙ্গে। চোখ বুলাতেই দেখা যায়, দোকানের দেয়ালজুড়ে পরিবেশ ও বৃক্ষরোপণবিষয়ক নানা সচেতনতামূলক লেখা। দোকান থেকে কিছুটা দূরে খোলা মাঠে দেখা যায় সারি সারি ফলদ গাছ। কথার একফাঁকে জানা যায়, সব কটিই তিনি লাগিয়েছেন।

নুরুল হক বলেন, হাটহাজারীর পাশাপাশি ফটিকছড়ি, আনোয়ারা, রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তিনি বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ করেছেন। কবরস্থান, খেলার মাঠের ধারে, স্কুলের মাঠ, পাহাড়ের পাদদেশ ও সড়কের দুই পাশসহ নানা স্থানে তাঁর লাগানো গাছ রয়েছে।

এলাকায় ‘ফতেয়াবাদ বৃক্ষরোপণ সমবায় সমিতি’ নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেছেন নুরুল হক। নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি এসব কার্যক্রমের ছবি-ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করেন। তাঁর দাবি, গত ৩০ বছরে প্রায় এক লাখ চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন তিনি।

পরিবেশ নিয়ে সচেতন নুরুল হকের পড়াশোনা অবশ্য বেশি দূর এগোয়নি। পঞ্চম শ্রেণির পর তিনি আর বিদ্যালয়ের যাননি। তাঁর এ কাজে স্ত্রী ও দুই ছেলেই সহযোগিতা করেন। বড় ছেলে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ভিডিও করা, ফেসবুকে পোস্ট করা, ক্যাপশন লেখা—এসব কিছু বড় ছেলেই করে। তাঁর ‘বৃক্ষপ্রেমী মো. নুরুল হক’ নামের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। বর্তমানে এ পেজের সাড়ে পাঁচ হাজার অনুসারী রয়েছে।

নুরুল হক জানান, ২০১০ সালে তিনি জীবিকার তাগিদে ওমানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরেন ২০১৪ সালে। এরপর আবার বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন। এ কাজের জন্য অনেকেই তাঁকে ট্রল করেছেন, পাগলও বলেছেন। এরপরও থামেননি। তিনি চান, প্রতিটি গ্রামে তাঁর মতো লোক তৈরি হোক। তাহলে পুরো দেশ গাছে ভরে যাবে।

নুরুলের গাছ নিয়েছেন আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারাও। ফটিকছড়ির নাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা আবিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নুরুল হকের দেওয়া কয়েকটি সুপারিগাছ তিনি বাড়িতে রোপণ করেছেন। এখন সেগুলোতে সুপারি ধরছে।

চৌধুরীহাট ফতেয়াবাদ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মারুফ সিদ্দিকী বলেন, ‘নুরুল হক একজন প্রকৃত পরিবেশ সচেতন মানুষ। তাঁকে আমরা সবাই বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেই চিনি। তাঁর মতো মানুষ প্রতিটি গ্রামে থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটাই রক্ষা পেত।’

তাঁর এ কাজের প্রশংসা করেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন। তিনি সম্প্রতি এ উপজেলায় বদলি হয়ে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নুরুল হকের কাজ প্রশংসার দাবি রাখে। তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।