কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ভ্যান হারিয়ে দিশাহারা দম্পতি। বৃহস্পতিবার দুপুরে
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ভ্যান হারিয়ে দিশাহারা দম্পতি। বৃহস্পতিবার দুপুরে

উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে দিশাহারা বৃদ্ধ দম্পতি

‘রোন (ঋণ) তুলে ভ্যানডা কিনিছিলাম। কেবল ১৭ ডা কিস্তি গেছে। এখনো অর্ধেকও যায়নি। আর ভ্যানকেন এ্যাম্বা হারা গেল। সব জাগা খুঁজেও পালো না। গরিব মানুষ। ভ্যান কিনার টাকা নাই। এখন বসে বসে আছে। বড় ছোয়ালডা ভাটায় ইটকাটা কাম করতেছে। কয়ডা করে আনতেছে। তাই খাওয়া হচ্ছে। এ্যাম্বা আর কয় দিন যাবিনি? রোন দেব নাকি চাল কিনে খাব? কেউ একখান ভ্যান দিলে আবার চলতি পারতাম।’

কথাগুলো বলছিলেন ছকিনা খাতুন (৫৪)। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের ভ্যানচালক মনোব্বর শেখের (৬৫) স্ত্রী। সংসারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ব্যাটারিচালিত ভ্যান চুরি হওয়ায় দিশাহারা হয়েছে পড়েছেন এই দম্পতি।

মনোব্বরের বয়স ৬৫ বছর। শরীরে বাসা বেঁধেছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ। এখন তাঁর বিশ্রাম করে দিন যাপনের কথা। কিন্তু স্ত্রী, দুই ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিসহ ছয়জনের সংসারে অভাব-অনটন থাকায় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে নিজ বাড়ি থেকে তাঁর ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানের সন্ধান পাননি। রোববার তিনি কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনোব্বরের টিনশেডের দোচালা দুটি ঘরের তিনটি কক্ষে স্ত্রী, সন্তান, নাতি ও ছেলের বউসহ ছয়জনের বাস। প্রায় ১০ বছর আগে ৩০ হাজার টাকায় একটি ভ্যান কিনেছিলেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে ২৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ভ্যানে নতুন ব্যাটারি লাগিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দোচালা টিনের ঘরের বারান্দা নেই। ঘরের সামনে ভ্যান রাখার স্থান। সেখানে বিদ্যুতের সরঞ্জাম থাকলেও ভ্যান নেই। কিস্তির বই হাতে ঘরের দরজায় বসে আছেন স্বামী-স্ত্রী। চোখেমুখে হতাশার ছাপ।

মনোব্বর শেখ বলেন, ‘আমার অ্যাজমা ও হার্টের সমস্যা। হাকো (হাঁপানি) লাগে। আমি চলতি পারিনে। ব্যাটারির ভ্যান বলে কোনোমতে চলতাম। সেই ভ্যানডাও হারা গেছে। এখন বাড়িতে বসে আছি। বড় ছোয়াল ভাটায় কামকাজ করে কয়ডা খাবার দিচ্ছে। এই কোনোভাবে চলছে। কেউ একটা ভ্যান দিলে চালাচুলো খাতাম।’ তাঁর ভাষ্য, ঘটনার দিন ফজরের নামাজ পড়তে উঠে দেখেন, ভ্যানটি নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটি না পেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মনোব্বর খুবই অসহায়, অসুস্থ ও গরিব মানুষ। এই বয়সে তাঁর বিশ্রাম নেওয়ার কথা। কিন্তু সংসারে অভাব-অনটন থাকায় ভ্যান চালিয়ে চলতেন। কিন্তু ভ্যানটি চুরি হওয়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে পরিবারটি।’

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগটির তদন্ত চলছে। ভ্যানটি উদ্ধারে তৎপর আছে পুলিশ।

কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, লিখিত আবেদন করলে বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।