
‘ব্যাটাক লিইয়্যা ইদ করবের চাই, তুমরা পেপারেত লিকে আইনা দেও।’ একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এভাবে আর্তনাদ করেছিলেন আলেয়া বেওয়া (৫৪)। ছেলে ছাড়া ঈদ করতে পারেননি। ঈদের দিন শুধু কেঁদেছেন। কোনো আয়োজনও ছিল না। তবে ঈদের চেয়েও বেশি আনন্দ ফিরে এসেছে আলেয়া বেওয়ার ঘরে। হারানো ছেলেকে ফিরে পেয়েছেন ১১ দিন পর।
আলেয়া বেওয়া রাজশাহীর বাগমারার রামগুইয়া গ্রামের বাসিন্দা। মানসিক প্রতিবন্ধী একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে শহরত আলী (৩২) মানসিক প্রতিবন্ধী। ১২ মার্চ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজ ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে গত শুক্রবার বাগমারা প্রেসক্লাবে আসেন আলেয়া বেওয়া।
সাংবাদিকদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা আলেয়া বেওয়া বলেছিলেন, মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে শহরত আলী প্রতি দিনের মতো ১২ মার্চ সকালে বের হয়েছিল। কিন্তু আর ফেরেননি। ছেলের অপেক্ষায় কয়েক দিন ছিলেন ফিরে আসবে বলে। তবে না আসায় এলাকায় মাইকিং ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করা হয়। তবে হদিস মিলছিল না। নিরুপায় হয়ে বাগমারা প্রেসক্লাবে এসেছিলেন। ছেলেকে নিয়ে ঈদ করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই ছেলেকে খোঁজে বের করার জন্য সাংবাদিকদের কাছে আঁকুতি জানান আলেয়া বেওয়া।
এ নিয়ে ঈদের দিন গত শনিবার প্রথম আলোর অনলাইনে নিখোঁজ ছেলে শহরত আলীর ছবিসহ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদটি এই প্রতিবেদক ফেসবুকে শেয়ার করেন। এটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এক ব্যক্তি শহরতকে বাগমারার তালতলি বাজারে গত সোমবার সকালে দেখেছেন বলে এই প্রতিবেদকের ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেন। বিষয়টি আলেয়া বেওয়াকে জানালে তিনি ছেলের ছবিসহ সেখানে ছুটে যান। তবে আর পাননি সেখানে। শহরত তাহেরপুরের দিকে চলে গেছেন বলে জানান অন্যরা। আলেয়া বেওয়া ভ্যান ভাড়া করে ছোটেন সেদিকেই। ওই দিন গভীর রাতে পুঠিয়ার সরগাছি এলাকায় পেয়ে যান ছেলে শহরত আলীকে।
আজ মঙ্গলবার সকালে আলেয়া বেওয়ার বাড়িতে গিয়ে শহরতকে দেখা যায়। শ্রীপুর-তাহেরপুর সড়কের পাশে রামগুইয়াতে একটি কুঁড়ে ঘরের সামনে বসে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। বসে বিড় বিড় করে কী যেন বলে চলেছেন আপন মনে। কিছুক্ষণ পর মা আলেয়া বেওয়া ছেলের জন্য একটি থালায় রান্না করা সেমাই নিয়ে আসেন। নিজ হাতে ছেলেকে খাইয়ে দেন। আলেয়া বেওয়া আরও জানান, নিখোঁজ ছেলেকে পাওয়ার পর সেমাই কিনে খেয়েছেন। মুরগি জবাই করে পোলাও রান্না করেছেন। তিন দিন পর ঈদের খাবার খেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটাক ফিরে পাইয়া ভালো লাগছে।’
শহরতকে সকালে গোসল করানোর পাশাপাশি চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া হয়েছে। তবে আলেয়ার চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়। ছেলেকে আবারও হারানোর আশঙ্কা করছেন। তিনি জানান, ছেলে আবার ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। বাবা মারা যাওয়ার পর সড়কের পাশে ছেলেমেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। হাঁস, মুরগি ও ছাগল পালন করে কোনো রকম সংসার চলে। প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আলেয়া বেওয়া বলেন, ‘পেপারেত খবর না হলে ব্যাটাক পাওয়া গেলোনানি।’
শহরত আলীর একমাত্র বোন লাকি খাতুন (২৬) বলেন, ‘আমার ভাই, ভালো আচিল (ছিল)। মানসের কাজকাম কইরা সংসার চালাত। টাকা জড়ো কইরা একটা মোবাইল ফোন কিনেছিল, ওই মোবাইল চুরি হবার পর পাগল হইয়া গেছে।’
প্রতিবেশীরা জানান, ১১ দিন ধরে আলেয়া বেওয়ার পরিবারে অশান্তি নেমে এসেছিল। শহরত মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর বাড়িতে থাকত। নিজের সঙ্গে কথা বলত। মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করত এবং বাড়ির বাইরে চলে যেত। তবে দিন শেষে আবার ফিরে আসত। এবারই ব্যতিক্রম হয়েছে। ওরা গবির মানুষ, টাকার অভাবে ছেলেটার চিকিৎসা করাতে পারছে না।