
গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়ে লংমার্চের প্রথম পর্ব শেষ করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। বিরোধী জোটের নেতারা বলেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে এবং ওয়াদা লঙ্ঘন করছে। আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকারও একই রাস্তায় হাঁটছে। এখনই সতর্ক না হলে এই সরকারের পরিণতিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই হবে।
আজ শনিবার রাতে চট্টগ্রামে সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিরোধী জোটের লংমার্চের প্রথম পর্বের (ঢাকা-চট্টগ্রাম) কর্মসূচি থেকে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এর আগে সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে সমাবেশের মাধ্যমে লংমার্চ কর্মসূচি শুরু হয়। চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি পথসভা করেন বিরোধী জোটের নেতারা। এসব পথসভায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মাধ্যমে রাত সাড়ে নয়টার দিকে লংমার্চ শেষ হয়।
বিরোধী জোটের লংমার্চের দাবি ছয়টি। এগুলো হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
গতকালের লংমার্চে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ছাড়াও দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান (মঞ্জু), লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান প্রমুখ অংশ নেন।
সমাবেশে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা যখন লংমার্চের ডাক দিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। আজ কিছু প্রতিক্রিয়া আপনারা শুনতে পেয়েছেন। আমরা পরিষ্কার একটা কথা বলি, আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। আগামী দিনে দেশে যে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে, তার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখনই প্রয়োজন হবে, আন্দোলনের ডাক তখনই আসবে।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সবাই বলেছি যে আপনারা হ্যাঁ বলুন। যদি হ্যাঁ বিজয়ী হয়, তাহলে গণভোটের রায় আমরা বাস্তবায়ন করব। বিএনপিও বলেছে, আমরাও বলেছি। বাংলাদেশের মানুষ বুক কেটে আশায় বুক বেঁধেছিল যে এবার একটা পরিবর্তন আসবে। সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পাবে, তারপর হাতে ভালো কাজ পাবে। তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। তার একটাও হয়নি।’
চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগের যে সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকার একই রাস্তা ধরে হাঁটছে। চট্টগ্রাম তার আরেকটা বাস্তব উদাহরণ। এখানে একজন মেয়র আছেন। এখন শুনি যে উনি যত দিন ইচ্ছা তত দিন থাকবেন। এটা কি সুশাসন নাকি ফ্যাসিবাদ? আপনি আসেন, আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। আপনি নেতৃত্ব দেন। আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘সরকারি দলের লোকেরা এখন সন্ত্রাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। যখন ছিনতাই করে তখন বলে, আমরা আওয়ামী লীগের লোক। ধরা পড়ার পরে দেখা যায়, সবগুলা বিএনপির লোক। একেই বলে গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচয়ে বড় গুপ্ত।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আছি। পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফেরত আসতে পারবে না। একইভাবে নতুন কোনো স্বৈরাচার হওয়ার রাস্তাও আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই অধিবেশনে এখনো সংসদে আছি। পরের অধিবেশনে যাব কি না, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। কারণ, জনগণের অধিকার, জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না। আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। তার আগেই আপনি হয় জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা ঐক্যবদ্ধভাবে কীভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া যায়, সেই রাস্তা খুঁজে বের করুন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘লংমার্চ সরকার পতনের জন্য নয়, সরকারকে জাগাতে এবং সতর্কসংকেত দিতে করা হয়েছে। তবে গণভোটের রায় কার্যকর না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে। গণভোটের আলোকে যদি সংবিধান সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, আমাদের এই সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন, সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।’
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শুধু নির্বাচন আদায় করাই বিএনপির উদ্দেশ্য ছিল। গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে দলটি আন্তরিক ছিল না। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই রায়কে উপেক্ষা করা হলে বাংলাদেশের মানুষ আবার রাজপথে নামবে এবং আন্দোলন হবে। ১৯৭০ সালের জনগণের রায় উপেক্ষা করার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। জনগণের বর্তমান রায় নিয়ে তামাশা করা হলে আবারও রাজপথে আন্দোলন হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সঙ্গে অতীতের বাকশালি সরকারের কোনো পার্থক্য নেই। দলীয় লোকদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে গণতন্ত্র ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মানুষ শান্তিতে নেই, ছেলে-মেয়েদের নিরাপত্তা নেই এবং চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তাও নেই। এ কারণে দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়।’
দেশে টাকা নেই, প্রতিদিন নতুন নোট ছাপানো হচ্ছে—এমন দাবি করে তিনি প্রশ্ন করেন, এ অবস্থায় অর্থনীতি কীভাবে এগোবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার আগে এক লাখ মানুষকে ছয় মাসের মধ্যে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে অনেক মানুষের চাকরি চলে গেছে। দেশের মানুষ নিরাপত্তা ও সুশাসন চায়। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সরকারের পরিবর্তনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।’