কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘আমি শুরু থেকেই বলে আসছি জামায়াতে ইসলামী মোনাফেক। প্রথমে আমার দল (বিএনপি) বুঝে না বুঝে আমাকে শাস্তি দিলেও এখন বুঝতে পারছে। এরা ইসলামকে বিশ্বাস করে না। জামায়াত হলো এ দেশের শত্রু। এরা বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না। এদের কোনো ইমান নাই। এরা পারে না, এমন কোনো খারাপ কাজ নাই।’
আজ সোমবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের ইটনা সদরের মিনি স্টেডিয়ামে নির্বাচনী প্রচারের শেষ জনসভায় ফজলুর রহমান এ কথা বলেন। প্রচারের শেষ দিনের নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে দুপুরের আগে থেকেই হাওরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকাসহ নানা যানবাহন নিয়ে ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে জড়ো হন নেতা-কর্মীরা। বেলা তিনটা থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী সভাটি সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা পর্যন্ত চলে। ঠিক ৫টা ১০ মিনিটে ফজলুর রহমান তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। ৪৫ মিনিট পরে বক্তব্য শেষ করেন। বক্তব্যের বেশি অংশই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবে উল্লেখ করে ফজলুর রহমান জনসভায় বলেন, ‘আমি আজকে বলে গেলাম, এই জামায়াতকে যদি থামাইতে হয়, এদের অপকর্ম যদি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত শক্তি এক হইতে হবে। এই দেশে আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ হবে।’
সবার কাছে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট প্রত্যাশা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘যে কথাটা বাংলাদেশে সাহস করে কেউ বলে না, সেই কথাটা আমি বলব। সংসদে ৩০০ এমপির মধ্যে আমি বাতি হয়ে জ্বলব। কাজেই ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের মানুষেরা আমাকে ভোট দিলে আপনারা গৌরবান্বিত হবেন।’ তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমি হয়তো আর বেশি দিন বাঁচব না। জীবনের শেষ সময়ে আমি আপনাদের কাছে ভোট চাই। এই কারণে ভোট দিবেন, হাওরাঞ্চলকে আমি সোনার সংসার করতে চাই।’
নিজের বয়সের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ফজলুর রহমান আরও বলেন, ‘আমার বয়স ৭৮ বছর, আমার বয়সের শেষসীমা। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আপনারা ইচ্ছা করলে আমার শেষজীবনে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভোট দিয়ে গৌরবান্বিত হতে পারেন।
মুক্তিযোদ্ধাকে ভোট দেওয়ার জন্য আর পাবেন না আপনারা। এই ভোটটা আপনারা দয়া করে আমাকে দেন। কেন দেবেন? এই কারণে দেবেন, আমি দেশটাকে ভালো করতে চাই। এই বাংলাদেশকে যদি ঠিক করতে হয়, আমাদের মতো রাজনৈতিক কর্মী ছাড়া, আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া কেউ এ দেশ ভালো করতে পারবে না। তাই আসন্ন নির্বাচনে সবাইকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে হবে।’ একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ইটনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এস এম কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় স্থানীয় নেতারাসহ ফজলুর রহমানের স্ত্রী উম্মে কুলসুম, ছেলে আনওয়ারুল কবীর ও অভিক রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জেলার হাওর অধ্যুষিত ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ আসন। এ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মো. রোকন রেজা শেখ। জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী কাজী রেহা কবির স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে ঘরে ঘরে নারী জাগরণের কথা বলে প্রচার চালাচ্ছেন। এ ছাড়া এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহীন রেজা চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিল্লাল আহমেদ মজুমদার, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের খায়রুল ইসলাম ঠাকুর, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের নূরুল ইসলাম, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. জয়নাল আবেদিন নির্বাচনী মাঠে লড়াই করছেন।
কিশোরগঞ্জের ছয়টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে এ আসনটি সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। কারণ, এ আসন থেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আওয়ামী লীগের টিকিটে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
স্থানীয় লোকজন ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসনটি থেকে নির্বাচিত হতে হলে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে হবে। সে জন্য অনেকেই প্রকাশ্যে ও গোপনে আওয়ামী লীগের ভোট কাছে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকে আবার বলছেন, আসনটি দীর্ঘদিন ধরে রেখেছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পরিবার। তাই তাদের বলয় সব সময় এখানে থাকবে। তাদের ইশারা–ইঙ্গিতেও এখানে কিছু হতে পারে। সে জন্য অনেকেই ভোটকে সামনে রেখে এ পরিবারের প্রতি নমনীয় ভাষায় কথা বলছেন।
তবে ইটনা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মনির উদ্দিন বলেন, ‘এ হাওরে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ শাসন করলেও উন্নয়নের নামে হাওরে জীববৈচিত্র্যের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সে ক্ষতি পোষাতে এবার বিএনপির বিকল্প নেই। তবে আমরা আশাবাদী, বিএনপির যে জোয়ার এসেছে, তাতে ধানের শীষ প্রতীক বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে।’
টিটু দেবনাথ নামে মিঠামইন সদরের একজন ভোটার বলেন, এখানকার ভোটাররা এবার অনেক হিসাব–নিকাশ করে ভোট দেবেন। বিশেষ করে যাঁরা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন, তাঁদের হিন্দু ভোটাররা বেছে নেবেন।
জাকির হোসেন নামে অষ্টগ্রাম সদরের একজন ভোটার বলেন, এখানে যিনি বিজয়ী হবেন তাঁকে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে হবে। যে কারণে প্রকাশ্যে কেউ আওয়ামী লীগের কাছে না গেলেও গোপনে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
আসনটির জামায়াতের প্রার্থী মো. রোকন রেজা শেখ বলেন, মানুষ এবার পরিবর্তন চাচ্ছে। ধর্ম–বর্ণ–নির্বিশেষে সবাই তাঁর হয়ে কাজ করছেন। এবার এ আসনে দাঁড়িপাল্লার জোয়ার উঠেছে।
জেলার ছয় আসনের মোট ৪৮ প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী হলেন কাজী রেহা কবির। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী মাঠে অনেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; কিন্তু কেউ হাওরের অবহেলিত নারীদের কথা ভাবেন না। আমি বিজয়ী হলে হাওরের ঘরে ঘরে নারী জাগরণ হবে। নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে।’
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহীন রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে হাওর জনপদের মানুষদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি। এবার তারা আমার ঘোড়া প্রতীকে ভোট দিয়ে সেই প্রতিদান দেবে। কারণ, এবারের নির্বাচন হলো স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন।’