মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজ উদ্ধারে চলছে খননকাজ। গত সোমবার চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচরে
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজ উদ্ধারে চলছে খননকাজ। গত সোমবার চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচরে

উড়িরচরে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বিদেশি জাহাজ, ৩৩ বছর পর তোলা হচ্ছে

ফসলের মাঠে এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে খনন। উৎসুক মানুষের ভিড় চারপাশে। ভিড় ঠেলে দেখা গেল, এরই মধ্যে খোঁড়া হয়েছে প্রায় ১৭ ফুট গভীর একটি গর্ত। এরপরও থেমে নেই গর্ত খোঁড়ার কাজ।

গত সোমবার এই চিত্র দেখা গেল সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরের উত্তর-পশ্চিমে চর ন্যাংটা এলাকায়। খননের উদ্দেশ্য, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি জাহাজ উদ্ধার। ৪ জানুয়ারি থেকে একাধিক এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে খনন।

উড়িরচরের বাংলাবাজার থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের কোস্টগার্ড কন্টিনজেন্টের পাশেই চলছে জাহাজ উদ্ধারের এই কাজ। ধানি জমি পার হয়ে সেখানে যেতেই চোখে পড়ে মাটি বোঝাই করে চলাচল করছে কয়েকটি ট্রাক। দুটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া এবং ২০০ ফুট দীর্ঘ জায়গাজুড়ে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। ১৭ ফুট গভীর পর্যন্ত খোঁড়া হলেও জাহাজের মূল কাঠামোর দেখা এখনো মেলেনি।

‘জাহাজ আটকি যাইবের ঘটনা মনে আছে। কিন্তু কত দিন আগে, তা ঠিক করি বলতে পারব না। সে সময় লক্ষ্মী অলারা (চর লক্ষ্মীর বাসিন্দারা) জাহাজের দামি জিনিস খুলে লই গেছে। তারপর দিনে দিনে জাহাজটা মাটিচাপা পইড়তে থাকে।’
মুকবুল হোসেন, উড়িরচরের বাসিন্দা

নিলামের নথি ঘেঁটে জানা গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির নাম এমভি টনি বেস্ট। লাইবেরিয়াভিত্তিক বেস্ট শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজটি ১৯৯৩ সালে এই এলাকার কাদায় আটকে পড়ে। পরে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং একাধিকবার মালিকানা পরিবর্তনের পর জাহাজটি মাটির নিচ থেকে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাসিন্দারা জানান, জাহাজটি যখন আটকে পড়ে, তখন চারপাশে কেবল জলরাশি ছিল, আশপাশে ছিল না কোনো স্থায়ী বসতি। পরের তিন দশকে সেখানে চর জেগে ওঠে, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বসতিও। শুরু হয় চরের জমি চাষাবাদ। একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়তে শুরু করে জাহাজটি। একপর্যায়ে এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

এলাকাবাসী জানান, প্রায় ১০ বছর আগে চরটিতে চাষাবাদ শুরু হয়। মাটির নিচে চাপা পড়ায় জাহাজটির কথা এলাকার মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎ আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হওয়ায় জাহাজটি নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই।

জাহাজটির প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন পাওয়া গেল এলাকায়। তাঁর নাম মুকবুল হোসেন (৭৫)। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে উড়িরচরে মহিষবাথানের মালিক তিনি। তাই এলাকায় পরিচিত ‘মুকবুল বাতানি’ নামে। জানতে চাইলে মুকবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজ আটকি যাইবের ঘটনা মনে আছে। কিন্তু কত দিন আগে, তা ঠিক করি বলতে পারব না। সে সময় লক্ষ্মী অলারা (চর লক্ষ্মীর বাসিন্দারা) জাহাজের দামি জিনিস খুলে লই গেছে। তারপর দিনে দিনে জাহাজটা মাটিচাপা পইড়তে থাকে।’

জাহাজটির বর্তমান মালিকানায় রয়েছে মেসার্স রায়হান ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪৭০ ফুট আর প্রস্থ ৬৮ ফুটের মতো। এখন স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য জাহাজটি তুলে আনার কাজ চলছে।

কতটা বড় এই জাহাজ

জাহাজটির নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেল, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলবর্তী দেশ লাইবেরিয়ার পতাকাধারী এই জাহাজ পানিতে ভেসেছে প্রায় ২২ বছর। ১৯৭১ সালে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে এটি বাংলাদেশের নোয়াখালী উপকূলের কাছে আটকে পড়ে সমুদ্রযাত্রার সমাপ্তি টানে।

জাহাজটির বর্তমানে মালিকানায় রয়েছে মেসার্স রায়হান ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪৭০ ফুট আর প্রস্থ ৬৮ ফুটের মতো। এখন স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য জাহাজটি তুলে আনার কাজ চলছে।

এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি খনন করে তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত সোমবার চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচরে

নিলাম, হাতবদল

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে জাহাজটি আটকে পড়ার পর শুরুতে উদ্ধারের চেষ্টা চালায় মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠান বেস্ট শিপিং করপোরেশন। তবে ব্যর্থ হয়ে জাহাজটি নিলামে (অকশন) দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আদালতের শরণাপন্ন হয় প্রতিষ্ঠানটি। কাদায় আটকে পড়া জাহাজকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বেস্ট শিপিং করপোরেশন, জাহাজের স্থানীয় প্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও ক্রু—সব পক্ষের স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে মামলায়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দেওয়ানি বিভাগের অ্যাডমিরালটি স্যুট (সমুদ্র বাণিজ্য-সংক্রান্ত মামলা) নম্বর ১৯/১৯৯৩ অনুযায়ী জাহাজটি নিলামে তোলা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ চট্টগ্রামের মুসলিম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান ৫৪ লাখ টাকায় জাহাজটি নিলামে কিনে নেয়।

প্রতিষ্ঠানটি জাহাজের উপরিভাগের সামান্য কিছু অংশ কেটে নিলেও পুরো জাহাজ আর উদ্ধার করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে কাজ থেমে যায়। পরে ৩০ লাখ টাকায় তারা জাহাজের স্বত্ব বিক্রি করে দেয় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরপর একের পর এক বদল হয় মালিকানা। তবে কেউ মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজের বাকি অংশ আর উদ্ধার করতে পারেনি। এবারের চেষ্টার আগে সর্বশেষ ২০১০ সালে ঢাকার ইউছুফ আলী নামের এক ব্যক্তি জাহাজটি কিনে মাটির নিচ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। তবে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

সর্বনিম্ন ৩২ ফুট আর সর্বোচ্চ ৫০ ফুট গভীরে জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। মোটামুটি ৪০ ফুট গভীরে পৌঁছালে জাহাজটি দৃশ্যমান হবে।
নুরুল হুদা, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মী

আবার উদ্ধার চেষ্টা

জাহাজটির বর্তমান মালিক মেসার্স রায়হান ট্রেডার্সের কর্ণধার মো. জামাল উদ্দিন জানান, বেশ বড় জাহাজটি যেখানে চাপা পড়ে আছে এর ওপরের প্রায় ১০ একর জমি তিনি কিনে নিয়েছেন। এখন মাটি খুঁড়ে জাহাজটি উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে উদ্ধারের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যন্ত্রপাতির সংকট।

জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বিরামহীন কাজ চলছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়া বেশি গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন সেই যন্ত্রপাতির খোঁজ করছি। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে।’

জাহাজটি উদ্ধারের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারে নামার আগে তাঁরা সেখানে বোরিং (মাটির গভীরে পাইপ প্রবেশ করিয়ে) করে জাহাজটির অবস্থান নিশ্চিত হয়েছেন। বোরিং কাজে যুক্ত নুরুল হুদা বলেন, ‘সর্বনিম্ন ৩২ ফুট আর সর্বোচ্চ ৫০ ফুট গভীরে জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। মোটামুটি ৪০ ফুট গভীরে পৌঁছালে জাহাজটি দৃশ্যমান হবে।’

খোঁড়াখুঁড়ির জন্য রায়হান ট্রেডার্স জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের লিখিত অনুমতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, মাটির এতটা গভীর থেকে জাহাজটি কেটে তুলে আনার কাজ হয়তো সহজ হবে না। এরপরও চেষ্টা চলছে।

জাহাজ তোলার খবর পেয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছে মানুষ। কৌতূহলী মানুষের মুখে লেগে আছে জাহাজটি নিয়ে নানা আলাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে আলোচনায় মেতেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের কেউ জাহাজ তোলার খবরে বাহবা দিচ্ছেন, কেউ লিখেছেন, ‘জাহাজ তোলার নামে মাটির ব্যবসা চলছে।’