নিহত রফিকুল ইসলাম
নিহত রফিকুল ইসলাম

খুলনায় বিএনপি নেতা রফিক হত্যা: সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ

খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগসূত্র আছে কি না, খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য হয়তো রফিকুল ইসলাম ছিলেন না। তবে ঘটনাচক্রে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে। শনিবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।

গতকাল শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে রফিকুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত রফিকুল ইসলামের বাড়ি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে। তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামেও পরিচিত এই নেতা পাথরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ির পাশের কাজীপাড়া বাজারে ছিলেন রফিকুল ইসলাম। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা এক দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলি তাঁর তলপেটে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাঁকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজনীতি বা ব্যবসা-সংক্রান্ত কোনো কারণে রফিকুলকে হত্যা করা হয়নি; বরং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সন্ত্রাসী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খুলনা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদন্তাধীন। এখনই কোনো কারণ নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে তাঁরা অনেক তথ্য পেয়েছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই করছেন। আশা করছেন, অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আলোচিত একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে রফিকুলের পরিবারের এক সদস্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পরে ওই সদস্যের অন্য একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গেও সখ্য গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে মাদক কেনাবেচা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। রফিকুল বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। রফিকুল এতে বাধা দেন এবং তাঁকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। সম্প্রতি ওই তরুণ এলাকায় ফিরেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য হয়তো পরিবারের ওই সদস্যই ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি রফিকুলের সঙ্গে ছিলেন। তবে রফিকুল তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার কারণে তিনিই গুলিবিদ্ধ হলেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

রফিকুলের স্ত্রী রিনা বেগম বলেন, ‘আমি জানি না, কীভাবে কী হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। কোনো মারামারি-ফ্যাসাদেও তিনি ছিলেন না। মাঝেমধ্যে ফোনে কারও সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হতো; কিন্তু কার সঙ্গে হতো, তা জানি না। কিছুদিন ধরে তাঁকে খুব মনমরা দেখতাম। জানতে চাইলে বলতেন, “তুমি তো সমাধান দিতে পারবে না, তোমাকে বলে লাভ কী।” আমার মনে হয়, তিনি রাজনীতি করতেন—এটাই তাঁর অপরাধ। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার দুই ছেলেকে যেন নিরাপত্তা দেওয়া হয়। তাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।’

রিনা বেগম আরও বলেন, ‘হত্যার বিচার কী হবে? আসামিরা ঠিকই খালাস পেয়ে যাবে। আমার ছেলেদের বাবা নেই, এখন তাদের নিরাপত্তা কে দেবে—এই চিন্তাতেই আছি। এখানে আগেও খুন হয়েছে, গুলি করে আহত করা হয়েছে। কিন্তু কিছুই তো হয়নি।’

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে আজ শনিবার রফিকুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে গত ২১ মে বটিয়াঘাটা উপজেলার পুটিমারী বাজারে জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে যুবদলের দুই কর্মীকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এ হত্যাকাণ্ডেও জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খুলনা মহানগর ও জেলায় বর্তমানে ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনা নগরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক বিরোধ ও পূর্বশত্রুতা কাজ করেছে।