সিলেটে কবি কাজী নজরুল ইসলামের শতবর্ষ স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবির লেখা গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা
সিলেটে কবি কাজী নজরুল ইসলামের শতবর্ষ স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবির লেখা গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা

এক শ বছর আগে কবি নজরুল এসেছিলেন সিলেটে, সেই স্মরণে দিনব্যাপী আয়োজন

১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে সিলেটে এসেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তখন তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। এ সময় শহরের সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ মজুমদার তাঁর সেবা করেন। ওই বাড়ির এক মেয়ের গান শুনে মুগ্ধ হন নজরুল। সিলেট পরিভ্রমণের সময় তিনি সিংহবাড়িতেও যান।

কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট পরিভ্রমণের শতবর্ষপূর্তি গতকাল রোববার ঘটা করে বর্ণিল আয়োজনে পালন করা হয়। ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল: শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ শীর্ষক এ আয়োজনজুড়ে ছিল কবির সৃষ্টি–বন্দনা। বিকেল সাড়ে চারটায় নগরের পূর্ব শাহি ঈদগাহ এলাকার জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাতে শেষ হয় আয়োজন।

সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ মজুমদারের উত্তরসূরিদের সংগঠন উপেন্দ্র-বীণাপাণি স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠান শুরু হয় সমবেত উদ্বোধনী সংগীতের মধ্য দিয়ে। পরে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিংহ পরিবারের সন্তান ও সমাজসেবী জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার। তিনি তাঁদের পরিবারে কবি নজরুলের আগমনের বিষয়টি সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ ও ১৯২৮ সালে সিলেট ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, দুবারই কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটের চৌহাট্টা এলাকার ঐতিহ্যবাহী সিংহবাড়িতে আসেন। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত সেই সিংহবাড়ির উদ্যোগে তাঁর ভ্রমণের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে স্মরণোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

সিলেটে কবি কাজী নজরুল ইসলামের শতবর্ষ স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। গতকাল রোববার বিকেলে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে

জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার বলেন, বাংলা সাহিত্যের দুই মহাতারকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটের সিংহবাড়িতে এসেছিলেন। এটি তাই একটি স্মৃতিধন্য স্থান। তাঁদের আগমন কেবল একটি পরিবারের গৌরব নয়, এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

বক্তব্যে জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার জানান, সিংহবাড়ির সঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক গভীর মানবিকতায় ভরপুর। ১৯২৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন সিলেটে অবস্থান করেন, তখন সিংহবাড়ির সদস্যদের আন্তরিক সেবা ও ভালোবাসা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই সম্পর্কের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে আছে সিংহবাড়ির মেয়ে লীলাবতী মজুমদারের উদ্দেশে লেখা কবি নজরুলের একটি হৃদয়ছোঁয়া কবিতা।

শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরে নজরুলসংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন সিলেটের বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা। একক গান পরিবেশন করেন শিল্পী হিমাংশু বিশ্বাস, শর্মিলা সেন ঊর্মি, আনন্দী সেন, অনিরুদ্ধ সেন প্রমুখ। এ ছাড়া দলীয় নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি নবীন-প্রবীণ আবৃত্তিশিল্পীরা আবৃত্তি পরিবেশন করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন লেখক সঞ্জয় কুমার নাথ ও শাশ্বতী ঘোষ। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস, সিলেটের সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনের প্রেস, তথ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষাবিষয়ক দ্বিতীয় সচিব রাজেশ ভাটিয়া, গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আহমেদ নূর প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গতকাল বিকেলে প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই আয়োজন। অনুষ্ঠানে কবির সাহিত্য, সংগীত ও জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘শত বছর আগে কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটে প্রথম এসেছিলেন। সিংহবাড়িতেও সেই সময় তিনি এসেছিলেন। এই নগরের ইতিহাস-ঐতিহ্য লালনপালনে সিটি করপোরেশনের অবশ্যই দায়বদ্ধতা আছে। আসছে শীত মৌসুমে নজরুলের সিলেট পরিভ্রমণের শত বছর পূর্তি সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগেও দুই দিনব্যাপী আয়োজনে ঘটা করে পালন করার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। নজরুল অনুরাগী, গবেষক, শিক্ষক, সংগীতজ্ঞসহ নানা শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা কমিটি গঠন করে এ আয়োজন করা হবে।’

স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানে ‘সিংহবাড়িতে কবি নজরুল: শতবর্ষ স্মারক’ শিরোনামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এতে নজরুলের সিলেট-সংযোগ, তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিভিন্ন লেখকের লেখা ঠাঁই পেয়েছে।