উইপোকা ও ইঁদুর টাকা কেটে টুকরা টুকরা করেছে। সেগুলোই দেখাচ্ছেন তোফাজ্জল হোসেন। শুক্রবার বিকেলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের ধুমাইটারি গ্রামে
উইপোকা ও ইঁদুর টাকা কেটে টুকরা টুকরা করেছে। সেগুলোই দেখাচ্ছেন তোফাজ্জল হোসেন। শুক্রবার বিকেলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের ধুমাইটারি গ্রামে

জমানো দুই লাখ টাকা কেটে খেল ইঁদুর-উইপোকা, কৃষকের আহাজারি

‘আমার কী হইলো রে!’—বলে চাটাইয়ের ওপর মাথা আছড়ে কাঁদছিলেন ফাতেমা খাতুন (৫৫)। তাঁর সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ছেঁড়া ও কাটা ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট। পাশে বসে সেগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন তাঁর স্বামী তোফাজ্জল হোসেন (৭২)। কষ্ট করে জমানো প্রায় দুই লাখ টাকা এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ওই দম্পতি।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের ধুমাইটারি গ্রামের ঘটনা এটি। গত শুক্রবার বিকেলে কাঠের আলমারি খুলে তোফাজ্জল হোসেন দেখতে পান, সেখানে রাখা টাকার বেশির ভাগই উইপোকা ও ইঁদুরে কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে। আজ রোববার ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেন একজন প্রান্তিক কৃষক। তাঁর কোনো ছেলে নেই, তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে তিনি ঢাকায় রিকশা চালাতেন। বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। বর্তমানে অন্যের প্রায় দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। স্ত্রীকে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে।

রিকশা চালানোর আয় থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিলেন তোফাজ্জল। পরে সংসারের খরচ থেকে টাকা বাঁচিয়েও জমাতে থাকেন। কিছুদিন আগে শৌচাগার নির্মাণের জন্য তাঁর জামাতা তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দেন। এ ছাড়া জমি বন্ধক রাখার কিছু টাকাও ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা তিনি ঘরের কাঠের আলমারিতে রেখে দিয়েছিলেন।

তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘ট্যাকাগুলে হামার তিন বেটি, ইসতিরির (স্ত্রী) ভবিষতের চিনতে করি জমা করচিনো। হামার জামাই ৫০ হাজার দিচে, জমিন বনদোকের (বন্ধক) ট্যাকাও আচিলো। ধারেয়া (ইঁদুর) ঢুকিয়া সগ নষ্ট হয়া গ্যালো। পোরধানমন্ত্রীর (প্রধানমন্ত্রী) কাচে হামার অনুরোদ, হামার দিকে যানি দ্যাকে।’

ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাটাইয়ের ওপর ছেঁড়া ও কাটা টাকার নোট ছড়িয়ে আছে। তোফাজ্জল সেগুলো হাতে নিয়ে দেখছেন। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন স্ত্রী ফাতেমা খাতুন। আশপাশের লোকজনকে বলতে শোনা যায়—দুই লাখ টাকা হবে। সব ১০০০ আর ৫০০ টাকার নোট, একদম কেটে শেষ করে ফেলেছে।

তোফাজ্জল হোসেন খুবই অসহায় বলে জানান দহবন্দ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ছোবেদ আলী। তিনি জানান, চরাঞ্চল থেকে এসে তোফাজ্জল ধুমাইটারি গ্রামে বসতি গড়েছেন। তাঁর তেমন জমিজমা নেই। কৃষিকাজ করে কোনোভাবে সংসার চালান। সঞ্চয় করা টাকাগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি চরম বিপাকে পড়েছে।

দহবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তোফাজ্জল হোসেন টাকাগুলো জমিয়েছিলেন। উইপোকা ও ইঁদুরে টাকা কেটে নষ্ট করেছে। নষ্ট হওয়া টাকাগুলো আর ব্যবহার করা যাবে না। তবে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।