
ঘাড়ের স্নায়ুর জটিল সমস্যায় ভুগছেন খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নোয়াকাটি গ্রামের ভ্যানচালক জালাল গাজী। অস্ত্রোপচারের আশায় গত ১২ এপ্রিল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। বাইরে থেকে এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করিয়েছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ২০ মে তাঁর অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেদিন ভোরেই হাসপাতালের স্টোররুমে আগুন লাগে। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক মাস। এখনো তাঁর অস্ত্রোপচার হয়নি। এখন কবে ডাক পড়বে, সেই অপেক্ষায় তাঁর দিন কাটছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালের বারান্দায় বসে জালালের স্ত্রী আসমা বলেন, ‘আগুন লাগার পর থেকে শুধু শুনছি, পরে হবে। হাসপাতালে থাকতে থাকতে টাকাপয়সাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার চান্দেরখোলা এলাকার আবুল হাসেম খান ইউরোলজি বিভাগে ভর্তি আছেন প্রায় ২৮ দিন ধরে। প্রস্রাবের থলির সমস্যার অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা এই রোগী বলেন, কত দিন থাকতে হবে, কেউ বলতে পারছে না। বাড়ি ফিরে গেলে আবার কবে সুযোগ পাবেন, সেটিও জানেন না। তাই এখানেই থাকতে হচ্ছে।
জালাল ও হাসেমের মতো শতাধিক রোগী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গত ২০ মে অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পার হলেও এখনো চালু করা যায়নি হাসপাতালের একটি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইউনিট। অন্য ইউনিটে সীমিত পরিসরে জরুরি অস্ত্রোপচার চললেও নিয়মিত অস্ত্রোপচার পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
গতকাল হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, অনেক রোগী সপ্তাহের পর সপ্তাহ ওয়ার্ডের শয্যা কিংবা বারান্দায় অবস্থান করছেন। বাড়ি ফিরে গেলে আবার কবে অস্ত্রোপচারের সুযোগ মিলবে, সেই শঙ্কায় হাসপাতাল ছাড়তে পারছেন না। আবার কেউ কেউ অনিশ্চয়তায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
গত ২০ মে ভোরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় পুরোনো আইসিইউ ইউনিটসংলগ্ন একটি স্টোররুমে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
অগ্নিকাণ্ডে স্টোররুমের বিভিন্ন সরঞ্জাম, কিছু সিলিন্ডার ও ভবনের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ওই অংশেই ছিল তিনটি অপারেশন থিয়েটার ও পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট। ফলে হাসপাতালের নিয়মিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে থাকা তিনটি ওটি কক্ষে রং করা হয়েছে। ফ্যান ও লোহার গেট বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ-সংযোগ ও গ্যাস পাইপলাইনের কাজের জন্য দেয়াল কাটা হচ্ছে। অন্য অংশেও সংস্কার চলছে। তবে পুড়ে যাওয়া স্টোররুমে এখনো মালামাল পড়ে আছে। সেখানে পুড়ে যাওয়া পলেস্তারা অপসারণের কাজ চলছে।
সার্জারি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা এলাকার গুরুদাসী পেটের টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় দুই মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁর বোন সবিতা বলেন, ‘দুই মাসের বেশি হাসপাতালে আছি। রোগীর সঙ্গে আরও দুজন থাকছি। এত দিন থাকায় খাওয়াদাওয়ার কষ্ট হচ্ছে। কত দিন আর এভাবে থাকা যায়? এখন শুনছি আগামী সপ্তাহে নাকি অপারেশন হবে।’
যশোরের কেশবপুর উপজেলার সুখজাহান প্রায় আড়াই মাস ধরে খাদ্যনালির সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণে তাঁর অস্ত্রোপচার পিছিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘বলেছে, সরকার সিধে (ঠিক) করলে তারপর অপারেশন হবে। এসব বলে ছাড়পত্র দিতিল, আমরা নেইনি। ঈদে এখানে ছিলাম। গত তিন দিন আগে অপারেশনটা হয়েছে। মেলা দিন থাকায় পেরে ওঠা দায়।’
অন্যদিকে অস্ত্রোপচারের সম্ভাব্য তারিখ জানতে না পেরে আপাতত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডুমুরিয়ার কাপালিডাঙ্গা এলাকার আবু হানিফ। হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি হওয়া এই রোগী বলেন, সার্জারি ওয়ার্ড থেকে সপ্তাহে মাত্র দুজনের অপারেশন হচ্ছে বলে জানিয়েছে। তবে তাঁর চেয়ে আরও গুরুতর রোগী থাকায় এখন হবে না। আবার ডাক পড়লে তখন আসবেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি ইউনিটে প্রতি মাসে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০টি অস্ত্রোপচার হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর বর্তমানে প্রতিদিন সাত থেকে আটটির বেশি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও নির্ধারিত অস্ত্রোপচারের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, ‘আমাদের বিভাগে জরুরি সিজারিয়ানসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার হচ্ছে। কিন্তু নিয়মিত ওটি অনেক কমে গেছে। বিভাগটিতে আগে দুটি ইউনিটে সপ্তাহে ২০ থেকে ২২টি অস্ত্রোপচার হতো। এখন তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, চিকিৎসকদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।’
অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও আইসিইউ ইউনিটের ইনচার্জ সহযোগী অধ্যাপক দিলীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট পুরোপুরি চালু না থাকায় আইসিইউর কয়েকটি শয্যা পোস্ট-অপারেটিভ রোগীদের জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে আইসিইউ সেবাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ১০ শয্যার আইসিইউতে আগে থেকেই ১৫টি শয্যা ব্যবহার করে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সেখান থেকে চারটি শয্যা নিয়ে এবং অতিরিক্ত দুটি শয্যা যোগ করে একটি অংশ পোস্ট-অপারেটিভ ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে জরুরি অস্ত্রোপচার চালু রাখা গেলেও নির্ধারিত অস্ত্রোপচার সীমিত রাখতে হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও দরপত্র আহ্বানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছুটা সময় লেগেছে দাবি করে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের ছুটিতেও কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংস্কারকাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্টোররুমের মালামাল অন্য কক্ষে সরিয়ে নেওয়ার পর কক্ষ, দরজা, দেয়াল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইনের সংস্কার শেষ করা হবে।
হাসপাতালের পরিচালক আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে কমপক্ষে আরও ১৫ দিন সময় লাগবে। প্রথমে সিভিল ওয়ার্ক শেষ হবে, এরপর বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইনের কাজ করা হবে। তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ করা যাবে না। যাতে আবার কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করেই ওটি পুরোপুরি চালু করা হবে। তবে রোগীদের দুর্ভোগ হচ্ছে, সেটি আমরা উপলব্ধি করছি। জরুরি রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’