
চট্টগ্রামে থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছেন অপরাধীরা। দুই বছর আগে (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১৪৮টির হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানো ২৫ অস্ত্রধারীও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব অস্ত্রধারীরা যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তাঁদের প্রদর্শিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল, শটগান ও কাটা বন্দুক।
পুলিশের দাবি, থানা থেকে লুট হওয়া বেশির ভাগ অস্ত্র এরই মধ্যে উদ্ধার হয়েছে। বাকি অস্ত্রগুলোও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো অস্ত্রধারীদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে মামলা হয়েছে ১৫১টি। গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হলেও এসব মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ১৫টির। এর মধ্যে ১২টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৩টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এ সময় নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়েন যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে এসব ঘটনার ভিডিও-ছবি বিশ্লেষণ করে পুলিশ ৪৬ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করে পুলিশ। এর মধ্যে ২১ জন র্যাব-পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিরা পলাতক।
ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে দেখা যায়, নগরের মুরাদপুর এলাকায় (১৬ জুলাই) পিস্তল হাতে ছিলেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। কাটাবন্দুক হাতে ছিলেন যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মো. ফিরোজ। তিনি নিজেকে নগর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী পরিচয় দেন। তবে তিনি কোনো পদে নেই। শটগান হাতে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংগঠক মো. দেলোয়ারকে দেখা যায়। পিস্তল হাতে দেখা যায় যুবলীগ কর্মী এন এইচ মিঠু ও মো. জাফরকে। মিঠু ও জাফর নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। নুরুল আজিম নিজেও মুরাদপুরে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। হাত বদল হয়ে কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসী-অপরাধীদের কাছে গেছে, আর কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে। যেগুলো উদ্ধার হয়নি সেগুলো উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।আমিনুর রশিদ, সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম), চট্টগ্রাম নগর পুলিশ (সিএমপি)।
এসব অস্ত্রধারীর মধ্যে শুধু ফিরোজকে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে র্যাব, অন্যরা ধরা পড়েননি। পলাতক এসব অস্ত্রধারীর মধ্যে হেলাল উদ্দিন চৌধুরীসহ বেশ কজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব রয়েছেন। মুরাদপুরে গুলিবর্ষণকারীদের মধ্যে আহনাফ নামের এক ছাত্রলীগকর্মী এবং চকবাজার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মিঠুন চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার সময় তাঁদের হাতে পিস্তল দেখা গেলেও তা উদ্ধার করা যায়নি।
নগরের চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট এলাকায় ১৮ জুলাই পিস্তল হাতে দেখা যায় চান্দগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন ফরহাদ, যুবলীগ কর্মী মো. জালাল ওরফে ড্রিল জালাল, মো. জামাল, ঋভু মজুমদার ও মো. মিজানকে। শটগান হাতে ছিলেন যুবলীগ কর্মী মো. তৌহিদ। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন, অস্ত্রধারীরা সবাই নগরের ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর মো. এসরালের অনুসারী। আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এসরাল। এর মধ্যে তৌহিদুল, মিজান, জামাল ও ঋভু মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি ওয়ান শুটারগান নিয়ে তৌহিদুল একাই ছাত্র-জনতার ওপর ২৮টি গুলি চালিয়েছেন।
এদিকে ৪ আগস্ট বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে নগরের জামাল খান ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশের নেতৃত্বে নগরের আসকার দিঘির পাড় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দিতে দেখা গেছে। ওই সময় তাঁর পাশে থাকা এক যুবককে শটগান হাতে দেখা যায়। তাঁর নাম ফরহাদুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে রিন্টু। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে মামলা হয়েছে ১৫১টি। গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হলেও এসব মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ১৫টির। এর মধ্যে ১২টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৩টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্র দেওয়া ১২ মামলার মধ্যে একটি হত্যা মামলা। ১৫১টি মামলার মধ্যে নগর ও জেলার ৯টি থানায় হয়েছে ৬৯টি। বাকি ৮২টি মামলা আদালতে দায়ের করা নালিশি মামলা (সিআর)। এসব মামলায় নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের নামও রয়েছে।
এ দিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের আট থানাসহ পুলিশের ২৯ স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭৯৬টি উদ্ধার হয় গত দুই বছরে। গোলাবারুদ উদ্ধার হয় ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড। এখনো উদ্ধার করা যায়নি ১৪৮টি অস্ত্র। এসব অস্ত্র এখন অপরাধীদের হাতে। ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে অপরাধীরা।
নগরের খুলশী আমবাগান এলাকায় গত ২৫ জুলাই মাদক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী মো. আলমগীরকে ধরতে অভিযানে যায় পুলিশ। ওই সময় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অভিযান চালিয়ে দুটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া পিস্তল দুটি নগরের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
চলতি বছরের ১৬ জুন নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের একটি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার হয় এক কাভার্ডভ্যানচালকের কাছ থেকে। এর আগে গত বছরের ১৮ জুন পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া একটি সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু (৭.৬২) এমএম পিস্তল উদ্ধার হয় সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে ব্লেড মাসুম নামের এক পেশাদার ছিনতাইকারীর কাছ থেকে।
জানতে চাইলে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে কিছু অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
থানা লুটের অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। হাত বদল হয়ে কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসী-অপরাধীদের কাছে গেছে, আর কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে। যেগুলো উদ্ধার হয়নি সেগুলো উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীরা ধরা না পড়া এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় অপরাধ বাড়ছে। এতে আতঙ্ক বাড়ছে মানুষের।’