যুবদল নেতা বেলাল হোসেন
যুবদল নেতা বেলাল হোসেন

চোরাচালান মামলার আসামি যুবদল নেতা, তবু হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন ওরফে সুমনের নাম রয়েছে হাতিয়া থানার একটি চোরাচালান মামলায় অভিযোগপত্রে (চার্জশিট)। মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও। এরপরও তাঁকে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিসহ বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে। কেবল তাই নয়, প্রশাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথিও হন তিনি।

তবে বেলাল হোসেনের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি অবহিত ছিলেন না। দুই দিন আগেই তিনি বিষয়টি জেনেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ইন্ধনে তাঁকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে ওই মামলায় জড়ানো হয়েছে। বেলাল বলেন, তিনি আজ বুধবার নোয়াখালী জেলা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছেন। আদালত শুনানি শেষে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি শাহদাত হোসেনও যুবদল নেতার জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বেলাল হোসেন উপজেলার চর আমানউল্যাহ ইউনিয়নের বাসিন্দা। ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত একই ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পেশায় খাসেরহাট বাজারের একজন রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ী। বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে স্থানীয়ভাবে তিনি বেশ সক্রিয় ছিলেন বলেও জানা গেছে।

বিগত ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর হাতিয়ার চানন্দি ইউনিয়নের কালাবাহাদুর বাজার-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও কোমল পানীয় মিয়ানমারে পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। এসব মালামালসহ চারজনকে আটক করে কোস্টগার্ড। আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের নেতা বেলাল হোসেন, মাহে আলম প্রকাশ ও এনায়েত উল্যাহ মেম্বারকে ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা হয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে অবশ্য বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি গণ্যমান্য ব্যক্তির কোটায় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটির সদস্য হন এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেন।

তবে সম্প্রতি জানা যায়, হাতিয়া থানার একটি চোরাচালান মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি তিনি। তিনিসহ সাতজন আসামির নাম রয়েছে গত ১০ মে আদালতে দায়ের করা অভিযোগপত্রে। হাতিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন চন্দ্র নাথ ওই অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

আদালতে দাখিল করা ওই অভিযোগপত্রে যুবদল নেতা বেলাল হোসেনের (৪৫) নাম রয়েছে ৭ নম্বরে। বাকি ছয় আসামি হলেন মো. হান্নান (৪৯), ইকবাল হোসেন (১৯), মো. রাশেদ রহমান (৫৫), আইয়ুব নবী (৩৯), মাহে আলম (৪৫) ও এনায়েত উল্যাহ প্রকাশ এনাম মেম্বার (৪০)। এর মধ্যে প্রথম চারজন ঘটনাস্থল থেকে কোস্টগার্ডের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর হাতিয়ার চানন্দি ইউনিয়নের কালাবাহাদুর বাজার-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকায় করে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও কোমল পানীয় মিয়ানমারে পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। এসব মালামালসহ চারজনকে আটক করে কোস্টগার্ড। আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের নেতা বেলাল হোসেন, মাহে আলম প্রকাশ ও এনায়েত উল্যাহ মেম্বারকে ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা হয়।

মামলার এজাহার ও সাক্ষীদের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় নৌকাটিতে প্রায় ৭০০ বস্তা সিমেন্ট এবং প্রায় ৪০০ ক্যারেট কোমল পানীয় ছিল। আটক ব্যক্তিদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে মামলার নথিতে বলা হয়েছে, এসব পণ্য মিয়ানমারে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নৌকায় তোলা হয়েছিল। যুবদল নেতা বেলাল হোসেনসহ অপর আসামিরা তাঁদের সহায়তা করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যুবদল নেতা বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমি বিগত ২০০৯ সাল থেকে একাধিক সিমেন্ট ও রড কোম্পানির পরিবেশক হিসেবে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছি। পাশাপাশি রাজনীতি করি। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে জনগণের ভোটে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মো. শাহজাহানের পক্ষে মাঠে জোরালো ভূমিকা পালন করেছি, যা দলীয় রাজনৈতিক একটি পক্ষ ভালোভাবে নিতে পারেনি। যার দরুন পরিকল্পিতভাবে হাতিয়া থানার ওই মামলায় আমাকে জড়ানো হয়েছে। অথচ আমি ঘটনা ও মামলা সম্পর্কে কিছুই জানি না।’

বেলাল হোসেন বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমার কাজ হলো পণ্য বিক্রি করা। ক্রেতা পণ্য কিনে কোথায় নিচ্ছেন, সেটা তো আমার দেখার বা জানার দায়িত্ব নয়। তা ছাড়া মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সম্পর্কে যদি জানা থাকত, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না করে সরকারি কোনো কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করতাম না।’

যুবদল নেতা বেলালের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে গত সোমবার রাতে চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান দাবি করেন, দুই দিন আগে থানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজ পৌঁছেছে। তবে তিনি আদালত থেকে আজ জামিন নিয়েছেন। এই মামলা ছাড়া থানায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলাও নেই।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুবদল নেতা বেলাল হোসেন ওরফে সুমন উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি ও কৃষি কমিটির সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে হাতিয়া থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার বিষয়টি জানার পর তাঁকে কমিটিতে না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’