
কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর কলাতলী ওয়ার্ডের পাহাড়ঘেরা আদর্শগ্রাম এলাকা। একখণ্ড জমিতে টিনের ঘরে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকতেন অটোরিকশাচালক মোতাহের মিয়া (৩৫)। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে শহরের ব্যস্ততম কলাতলী বাইপাস এলাকার ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামের একটি গ্যাসপাম্পে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনায় ৪টি বাড়ি, একটি গ্যারেজে রাখা ৪০টি গাড়িসহ নানা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন। এর মধ্যে মোতাহেরসহ ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। ৫ মার্চ সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোতাহেরের মৃত্যু হয়।
গতকাল রোববার বিকেলে মোতাহের মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বাড়িতে ঈদের আনন্দের রেশ নেই। তিন শিশুসন্তান নিয়ে ঘরের কোণে বসে অলস সময় পার করছেন স্ত্রী মায়েশা আক্তার। পরনে পুরোনো কাপড়, ঘরে নেই খাবারের বিশেষ আয়োজন। ঘরজুড়ে বিরাজ করছে শূন্যতা।
২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে কক্সবাজার শহরের ব্যস্ততম কলাতলী বাইপাস এলাকার ‘ কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামের একটি গ্যাসপাম্পে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনায় চারটি বাড়ি, একটি গ্যারেজে রাখা ৪০টি গাড়িসহ নানা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়।
আক্ষেপের সুরে মায়েশা আক্তার বলেন, স্বামীই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসার পেছনে সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। ঈদে সন্তানদের নতুন জামা কিনে দেওয়া তো দূরের কথা, ঠিকমতো দুই বেলা খাবারও জুটছে না। মায়েশা আরও বলেন, ‘স্বামীর চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করতে হয়েছে অনেক। সেই ঋণ শোধ করার উপায়ও নেই। বাড়ির পাশের সৈকতে লাখ লাখ পর্যটকের উপস্থিতিতে ঈদের আনন্দ-উৎসব চলছে, কিন্তু আমাদের ঘরে কোনো আনন্দ নেই। বাচ্চারা সারাক্ষণ নতুন জামার জন্য কান্নাকাটি করছে।’
নতুন জামা কেনা হয়নি, ঈদও হয়নি
মোতাহেরের পাশেই থাকতেন আবু তাহের (৪৫) ও মো. রহিম (৩৭)। তাঁরা দুজনও পাম্পে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনায় দগ্ধ হয়েছিলেন। ৩ মার্চ সকাল আটটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবু তাহের এবং পরের দিন একই হাসপাতালে মো. রহিমের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তির পর অবস্থার অবনতি হলে তাহের ও রহিমকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল। রহিম গ্যারেজমালিক। আবু তাহের পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। পাম্পের পাশে ছিল রহিমের গ্যারেজ। আগুনে গ্যারেজে রাখা রহিমের মালিকানাধীন ৪টি জিপসহ ৪০টি গাড়ি পুড়ে যায়। আবু তাহের ও রহিম সেদিন রাতে গ্যারেজে ঘুমিয়ে ছিলেন।
আদর্শগ্রামের ছোট্ট একটি ঘরে থাকেন আবু তাহেরের স্ত্রী, দুই ও তিন বছরের দুই মেয়ে, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছেলে ও কলেজপড়ুয়া এক ছেলে। বড় ছেলে কলেজছাত্র সোহেল ইসলাম বলেন, ‘বাবা ছিলেন আমাদের সবকিছু। বাবাকে হারিয়ে আমরা দিশাহারা হয়ে গেছি।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে সোহেল বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর ভাড়া বাসা ছেড়ে এখন নানুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। ঈদও হয়নি। ছোট ভাইবোনদের নতুন জামা কিনে দিতে না পারার কষ্ট সইতে পারছি না।’
সোহেলের বাবা আবু তাহের অটোরিকশা চালিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে সোহেলকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। লেখাপড়া বন্ধ রেখে শহরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন।
কলাতলীর বাসিন্দা নিহত গ্যারেজমালিক রহিমের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। একটি জরাজীর্ণ ঘরে তিন সন্তান নিয়ে থাকেন স্ত্রী। বৃষ্টি হলে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে পানি ঢোকে, দেয়ালেও ফাটল। টানাপোড়েনের এই সংসারে এখন যোগ হয়েছে আরেক অনিশ্চয়তা। নিহত রহিমের ছোট ভাই ধলু মিয়া বলেন, এই ঘরেও ঈদের ছোঁয়া লাগেনি। কারও গায়ে ওঠেনি নতুন কাপড়। সংসার কীভাবে চলবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না কেউ।
দুর্ঘটনার পর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা পায়নি হতাহত লোকজনের পরিবার। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, শহরের ব্যস্ততম একটি সড়কের পাশে অবৈধভাবে গ্যাসপাম্পটি নির্মাণ করা হয়েছিল। উদ্বোধনের এক দিন পর পাম্পে বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও ছয়জন চট্টগ্রাম ও ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। অথচ এসব পরিবারের খোঁজ রাখেননি কেউ। ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না কেউ।
উল্লেখ্য, লাইসেন্সবিহীন গ্যাসপাম্প স্থাপনের দায়ে ১ মার্চ রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় কক্সবাজার এলপিজি স্টেশনের মালিক ও রামুর বাসিন্দা নুরুল আলম প্রকাশের বিরুদ্ধে মামলা করেন বিস্ফোরক পরিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন। সম্প্রতি র্যাব ঢাকা থেকে নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন করার জন্য জেলা প্রশাসনের অনাপত্তিপত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিপত্র এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়া হয়নি।