মগড়ায় তখন জোয়ার-ভাটা হতো। নদীর বুক দিয়ে পালতোলা নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ চলত। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় মহাজনি নৌকা আসত। ধান-পাট বোঝাই করে ব্যবসায়ীরা ফিরে যেতেন দেশের নানা প্রান্তে। নদীতে ছিল স্রোত, নৌযান আর মানুষের কোলাহল।
নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মগড়া নদীর এমন অবস্থা দেখেছেন শহরের মোক্তারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও ছড়াকার শ্যামলেন্দু পাল (৭৮)। তাঁর ভাষায়, ছয় দশক আগেও মগড়া ছিল প্রমত্ত। এখন তা শুধুই স্মৃতি। দখল ও দূষণে নদীটি এখন অনেকটা নিশ্চল ও অপরিচ্ছন্ন।
নেত্রকোনা শহরে মগড়া নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। বাসাবাড়ি, বাজার, কারখানা, ক্লিনিকের বর্জ্য ও পৌরসভার নর্দমার পানিতে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। পচা পানির দুর্গন্ধে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।
এবার সেই মগড়া পুনর্জীবিত করতে ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৪১ কিলোমিটার পুনঃখনন, শহরের অংশে দুই পাড়ে হাঁটার পথ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা আছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭–এর জুন পর্যন্ত।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক তাঁর বাংলাদেশের নদ-নদী গ্রন্থে লিখেছেন, ময়মনসিংহের ফুলপুরের ধলাই নদের দক্ষিণমুখী প্রবাহ থেকে মগড়া নদীর উৎপত্তি। নদীটি নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে আটপাড়া ও মদন উপজেলা হয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় ধনু নদে গিয়ে মিশেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, মগড়া নদীর দৈর্ঘ্য ১৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১১৬ কিলোমিটার নেত্রকোনা জেলায়। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অংশটি প্রায় ৭ কিলোমিটার। নদীটির গড় প্রস্থ ৩৮ মিটার।
চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে খননকাজ শুরু হবে। সাতটি প্যাকেজে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়ন করবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখছে।সাখাওয়াত হোসেন, জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নেত্রকোনা
নদীটি নেত্রকোনা শহরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। দুই তীর ঘিরেই গড়ে উঠেছে শহরের বিস্তীর্ণ জনপদ। আঁকাবাঁকা পথে শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির দুই অংশের যোগাযোগের জন্য রয়েছে অন্তত ছয়টি সেতু। এর মধ্যে মোক্তারপাড়া সেতু দিয়ে শহরের প্রধান সড়কে যাতায়াত হয়। শ্যামলেন্দু পাল বলেন, ১৯৬৫ সালে মোক্তারপাড়া এলাকায় প্রথম পাকা সেতু নির্মাণের পর বড় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে ছোট ও মাঝারি নৌকা চলত। প্রায় ৯ বছর আগে সেতুটি নতুন করে নির্মাণের পর নৌপথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশে নদীর দুই পাড়ে দখলের চিহ্ন। আনন্দবাজার থেকে পাটপট্টি পর্যন্ত সাতপাই, নাগড়া, তেরিবাজার, ছোটবাজার, মোক্তারপাড়া, কাটলি ও পাটপট্টি এলাকায় নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় ও পাউবোর হিসাবে, সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) খতিয়ান অনুযায়ী দুই পাড়ে অন্তত ৩৮১টি অবৈধ স্থাপনা। তবে বিআরএস (বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে) অনুযায়ী তা ৪৯টি। এসব দখল নিয়ে ১০৪টি উচ্ছেদ মোকদ্দমা ও ২০টি দেওয়ানি মামলা হয়েছে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে দ্রুতই অভিযান চালানো হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুনমুন জাহান।
দখলের পাশাপাশি মগড়ার জন্য বড় সংকট দূষণ। সাতপাই চক্ষু হাসপাতাল মোড়, কালীবাড়ি, পাটপট্টি, কাটলি, নাগড়া, থানা মোড় ও ঘুষের বাজার এলাকায় নদীর পাড়ে জমে আছে নানা ধরনের বর্জ্য। কাঁচা শাকসবজির বর্জ্য, কারখানার বর্জ্য, ক্লিনিকের বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা—সবই ফেলা হচ্ছে নদীতে। পৌরসভার ১৩টি নর্দমার পানি নদীতে পড়ছে। কোনো কোনো বাড়ির পয়োনালার সংযোগ থাকায় মলমূত্রও নদীতে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের দাবির পর এবার মগড়া নদী পুনর্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে পাউবো। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে নদী খননে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বাকি অর্থ শহরের অংশে নদীর দুই পাশে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটার ব্যবস্থা ও সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় করার পরিকল্পনা আছে।
মগড়া নদী পুনঃখননের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান পাউবোর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ফসল রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে নদীটি। চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে খননকাজ শুরু হবে। সাতটি প্যাকেজে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়ন করবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখছে।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মগড়া নদী দখলমুক্ত ও সংস্কার করে এটিকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।