প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ঢাকার সঙ্গে রেললাইন স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বসিত মানিকগঞ্জবাসী

রাজধানী ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন দীর্ঘদিনের দাবি মানিকগঞ্জবাসীর। অবশেষে সেই দাবির বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এতে জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস বইছে।

জেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রেলপথ সংযোগ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, বরং জেলার অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। রাজধানীর নিকটবর্তী জেলা হওয়া সত্ত্বেও মানিকগঞ্জ এখনো রেল নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে সড়কপথে দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত সময়ে রেললাইন স্থাপন বাস্তবায়ন দেখতে চান তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, সভা-সেমিনার এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জেলার মানুষ ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইনের দাবির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ এপ্রিল মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে আধা সরকারি পত্র (ডিওলেটার) দেন। এরপর ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

জেলার একাধিক ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, কমিউটার ট্রেন চালু হলে সকালে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় গিয়ে অফিস, ব্যবসা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় আবার নিজ জেলায় ফিরে আসা সম্ভব হবে। এতে রাজধানীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন কমবে এবং ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপও হ্রাস পাবে।

মানিকগঞ্জ শহরের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী সামছুন্নবী তুলিপ বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে রেললাইনের দাবি জানিয়ে আসছি। যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পাবে। শিল্পকারখানা ও বিনিয়োগও বাড়বে।’
সামাজিক সংগঠন উত্তরণের সভাপতি বিমল রায় বলেন, রেলপথ স্থাপনের দাবিতে অতীতে বহু কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের ভারসাম্য আনতে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে দ্রুত ও আধুনিক গণপরিবহন সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমিউটার ট্রেনব্যবস্থা নগরায়ণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও বৈদ্যুতিক ও আধুনিক কমিউটার ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

মানিকগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবদুস সালাম বাদল বলেন, রেলপথ চালু হলে জেলার কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা যাবে। এতে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।

এদিকে রেললাইন স্থাপনেসর নীতিগত সিদ্ধান্তের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়টিকে ‘মানিকগঞ্জের জন্য নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন জেলা জজ আদালতের তরুণ আইনজীবী মো. জিন্নাহ খান। তিনি বলেন, রেল সংযোগ বাস্তবায়িত হলে জেলার উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী আফরোজা খানম নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল।

আফরোজা খানম রিতা বলেন, ‘মানিকগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল রেললাইন সংযোগ। জনগণের সেই দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরে এনেছি। এ ছাড়া এটি আমার নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। নীতিগতভাবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হওয়ায় আমি আশাবাদী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলার মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘মানিকগঞ্জের উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। রেল সংযোগ বাস্তবায়ন হলে এটি শুধু মানিকগঞ্জ নয়, সমগ্র মধ্যাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’

জেলার বিশিষ্টজনদের মতে, এখন প্রয়োজন দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই, রুট নির্ধারণ এবং প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করা। তাঁদের আশা, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাস্তবে রূপ নিয়ে মানিকগঞ্জকে দেশের আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে।

রেলপথের গুরুত্ব তুলে ধরে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মানিকগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, রেললাইন সংযোগ ও কমিউটার ট্রেন চালুর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানিকগঞ্জের মানুষের বহু বছরের প্রত্যাশা পূরণ হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর ওপর চাপ কমানো, আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।