খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে মসজিদ গলির এই ভবনে আজমুল হোসেনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। গল্লামারি হল রোড, খুলনা, ২০ সেপ্টেম্বর
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে মসজিদ গলির এই ভবনে আজমুল হোসেনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। গল্লামারি হল রোড, খুলনা, ২০ সেপ্টেম্বর

খুলনায় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলছেন, ‘আমি কিছু জানি না’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশের সীমানাপ্রাচীরের বাইরের রাস্তাটি হল রোড নামে পরিচিত। নগরের ইসলামনগর এলাকার এই রাস্তার পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী (খাজা হল) হলের একটি ফটক। বিপরীতে চলে গেছে সরু একটি গলি। মসজিদ গলি নামের এই গলির কয়েকটি বাড়ির পরই হালকা গোলাপি রঙের চারতলা একটি ভবন। ভবনটির পুরোটাই ছাত্রদের মেস।

ওই মেসেরই চতুর্থ তলার একটি কক্ষে থাকতেন বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চুরির অভিযোগ তুলে ওই মেসে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘শুক্রবার রাতে আজমুল ফোন করে জানায়, মেসে তার বিরুদ্ধে ভাত ও কিছু টাকা চুরির অভিযোগ তুলে এক লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওখানে কিডা আছে? বলল, “ওরা সবাই আছে।” আমি বললাম, দে তো। তখন ওরা বলছে, “চাচা, আপনার ছেলে এমন করসে, আপনি এক লাখ টাকা নিয়ে চলে আসেন।” এরপর আমি খুলনায় এসে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছেলের লাশ খুঁজে পাই।’

আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেসটিতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। মেস খোলা থাকলেও চারতলা ভবনের প্রতিটি কক্ষই ছিল তালাবদ্ধ। ভবনটির প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ। এর মধ্যে চতুর্থ তলার একটি কক্ষে থাকতেন আজমুল। আজমুলের কক্ষের পাশেই ভবনের সিঁড়ি। ওই রাতে তাঁকে মারধর করতে করতে ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভবনটিতে সংবাদকর্মী ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী বা বাসিন্দাকে পাওয়া যায়নি। কক্ষগুলোতে এখন কেউ না থাকলেও করিডরে শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত জামাকাপড় ও জুতা–স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। খোলা ছিল ছাদের ফটকও।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ রাজি হননি। অধিকাংশই ‘আমি ছিলাম না, জানি না’ বলে এড়িয়ে যান। পাশের গলির এক প্রবীণ বলেন, ‘বাবা, এখানে সব স্টুডেন্ট থাকে। একটা ঝামেলা হোক, কেউ চায় না। স্থানীয়দের চেয়ে এলাকায় ছাত্রই বেশি।’

প্রতিটি মেসের দরজায় তালা দেওয়া। নেই কোনো শিক্ষার্থী। গল্লামারি হল রোড, খুলনা, ২০ সেপ্টেম্বর

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে আসা মেডিক্যাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের অনেকে এ এলাকার বিভিন্ন মেসে ভাড়ায় থাকেন। পাশের একটি ভবনে থাকা এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন যেন কেমন একটা পরিবেশ। গতকাল দুপুর পর্যন্ত মানুষের স্বাভাবিক আনাগোনা ছিল। আজ চলাচল অনেক কমে গেছে। সবাই একটু চুপচাপ আছে।’ সেই রাতে কী হয়েছিল জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি কিছু জানি না।’

খানজাহান আলী হল গেট–সংলগ্ন মোল্লা টাওয়ারের গলিতে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাস ও আশপাশের পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে মসজিদ গলি কিছুটা নিরিবিলি এখন। তাঁরা শুনেছেন, যাঁরা মারধর করেছেন, তাঁরা সবাই পালিয়ে গেছেন। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে ক্যাম্পাসে (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে) আন্দোলন চলছে।

তবে গতকাল শনিবার স্থানীয় এক নারীসহ তিনজন রাতে ওই ভবনে চিৎকারের শব্দ পাওয়ার কথা বলেছিলেন। তাঁরা ওই ছাত্রকে রাত একটার পর হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেন বলেও জানান।

এদিকে এ ঘটনায় খুলনার হরিণটানা থানায় নিহত আজমুলের বাবা মো. কুতুব উদ্দিন একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক ৪ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন। তবে আজ বেলা পৌনে দুইটা পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।