সিলেট ৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে বিজয় চিহ্ন দেখান তিনি। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায়
সিলেট ৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে বিজয় চিহ্ন দেখান তিনি। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায়

সিলেটে কমিশনার থেকে মেয়র আরিফুল এবার হলেন এমপি

সিলেটে এক নামেই তাঁর পরিচয়। কেউ ডাকেন ‘আরিফ ভাই’। কেউবা বলেন ‘মেয়র সাব’। এরপরই যাঁর চেহারা ভেসে ওঠে, তিনি আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার (বর্তমান পদের নাম কাউন্সিলর) হিসেবে প্রথম জনপ্রতিনিধি হন। এরপর টানা দুইবার ছিলেন মেয়র। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি (সংসদ সদস্য) হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বেসরকারিভাবে আরিফুল হককে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। আরিফুল হক ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬টি ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের জয়নাল আবেদীন ৭১ হাজার ৩৯১ ভোট পেয়েছেন।

মানুষ যে বিপুল সমর্থন দিয়ে আমাকে এমপি নির্বাচিত করেছেন, এর ঋণ শোধ করার মতো কোনো ক্ষমতা আমার নেই। তবে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সুখে-দুঃখে সিলেট-৪ আসনের মানুষের পাশে আমৃত্যু থাকব।
আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপি প্রার্থী, সিলেট–৪

যোগাযোগ করলে আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ যে বিপুল সমর্থন দিয়ে আমাকে এমপি নির্বাচিত করেছেন, এর ঋণ শোধ করার মতো কোনো ক্ষমতা আমার নেই। তবে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সুখে-দুঃখে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনের মানুষের পাশে আমৃত্যু থাকব। নির্বাচনী প্রচারণাকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেসব পূরণ করাই হবে আমার একমাত্র লক্ষ্য।’

সিলেট বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-১ (নগর ও সদর) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আরিফুল হক। তবে এ আসনে মনোনয়ন পান বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। এর আগে দলের উচ্চ পর্যায় থেকে সিলেট-১-এর পরিবর্তে বেশ কয়েকবার সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য বললেও তিনি রাজি হননি। গত ৫ নভেম্বর রাতে দলের হাইকমান্ড তাঁকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে নির্দেশনা দেন। পরে ৭ নভেম্বর থেকে তিনি নির্বাচনী এলাকায় প্রচার শুরু করেন। ৪ ডিসেম্বর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়।

আরিফুল হক বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য। এর আগে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং এমসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

তবে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এবং তখনকার বিএনপি-দলীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে মূলত তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ২০০৩ সালে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই সঙ্গে তিনি তখন সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়টাতে প্রয়াত অর্থমন্ত্রীর সাইফুর রহমানের সিলেটকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরিফুল হকই দেখভাল করতেন। তাঁকে তখন অনেকে ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ হিসেবেও মনে করতেন।

আরিফুল ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়র হন। ২০১৮ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। একমাত্র সিলেটে বিএনপি থেকে আরিফুল হক মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সর্বশেষ ২০২৩ সালে বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তিনি প্রার্থী হননি।

বিএনপির মনোনয়নে আরিফুল টানা দুই মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়ে সিলেটে অনেক উন্নয়নকাজ করেছেন। দলমত–নির্বিশেষে সব মহলের কাছে তাঁর একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২১ জুন সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আরিফুলকে অংশ নেওয়ার জন্য দলের বাইরের ভোটারদের চাপ ছিল। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় জয় অনেকটা নিশ্চিত জেনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হননি। এতে দলের নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ে।

আরিফুল হকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, দুইবারের মেয়র আরিফুল হকের সিলেট-১ আসনে শক্ত অবস্থান। তিনি এখানে প্রার্থী হলে বিপুল ভোটে জয় পেতেন বলে সবার ধারণা ছিল। কিন্তু যে আসনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, সেটি তাঁর জন্য নতুন। এ ছাড়া আসনটি জামায়াতের জন্য সম্ভাবনাময় ছিল। কিন্তু অল্প দিনেই আরিফুল হক ওই আসনে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষের মন জয় করে নেন। এ কারণেই তিনি বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।