হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যায় কৃষক কৃষক মুহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসাইনের জিরাখেত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর এলাকায়। সম্প্রতি তোলা
হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যায় কৃষক কৃষক মুহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসাইনের জিরাখেত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর এলাকায়। সম্প্রতি তোলা

রোগে খেত নষ্ট, আর জিরা চাষ করবেন না কৃষক ইমতিয়াজ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রথমবারের মতো জিরার চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কৃষক মুহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসাইন। জিরার ফুল দেখে খুবই খুশি হয়েছিলেন তিনি। ফলনও আসতে শুরু করেছিল। তবে হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যায় পুরো জিরাখেত। অনেক চেষ্টার পরও ফলন বাঁচাতে পারেননি তিনি।

দীর্ঘ তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম করেও আশানুরূপ ফলন আনতে না পারার ক্ষোভে আর কখনো জিরা চাষ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কৃষক ইমতিয়াজ হোসাইন। উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর এলাকার মডেল কৃষক তিনি।

এ বছর পরীক্ষামূলক ১০ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করেছিলেন ইমতিয়াজ। জিরার বীজ সরবরাহ করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। শুধু ইমতিয়াজকে নয়, বারৈয়াঢালা ইউনিয়নে টেরিয়াইল গ্রামের আরও এক কৃষককেও এ বীজ দেওয়া হয়েছে। তবে বীজ থেকে চারা হওয়ার আগেই ওই কৃষকের খেত নষ্ট হয়ে যায়।

রোগ নির্ণয়ের অনেক চেষ্টা করেছি। কৃষি কর্মকর্তারা যে ওষুধ দিতে বলেছেন, সেটির প্রয়োগ করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই পাতা পুড়ে যাওয়া রোগ সারাতে পারিনি।
মুহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসাইন, কৃষক।

কৃষক ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আর জিরা চাষ করব না। তিন মাস পরিশ্রম করেও এ ফসলটি টিকাতে পারিনি। ফসল তোলার সময়ে হঠাৎ জিরাগাছের পাতায় লালচে মরিচা রোগ দেখা দেয়। অনেকটা অতিরিক্ত তাপে পুড়ে যাওয়ার মতো। রোগ নির্ণয়ের অনেক চেষ্টা করেছি। কৃষি কর্মকর্তারা যে ওষুধ দিতে বলেছেন, সেটির প্রয়োগ করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই পাতা পুড়ে যাওয়া রোগ সারাতে পারিনি।’

ইমতিয়াজ হোসাইন বলেন, ‘শুরু থেকে ফুল আসা পর্যন্ত আমার খেতটি অত্যন্ত ভালো ছিল। দেখে ভালো লাগত। ভেবেছিলাম জিরার ভালো ফলন পাব। কিন্তু খেত থেকে মাত্র এক কেজি জিরা পেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘জিরা চাষের খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেক কৃষক, আশপাশের মানুষ, জিরাখেত দেখতে আসত। তখন খুব ভালো লাগত। কিন্তু আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় এখন অনেক কষ্ট লাগছে।’

শীত কম থাকায় জিরাখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন ইমতিয়াজ হোসাইন। তিনি বলেন, ‘জিরা মূলত শীতকালীন ফসল। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে শীত শুরু হয় অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন আগে। শেষ হয়ও পরে। ফলে উত্তরাঞ্চলে জিরা চাষ সম্ভব। এ অঞ্চলে যেহেতু শীত কম থাকে, তাই এদিকে জিরাগাছ কিংবা ফুল যে কোনো মুহূর্তে রোগাক্রান্ত হতে পারে।’

উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষক ইমতিয়াজকে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক জিরা চাষ হয়েছে। মূলত পরিবেশ ও মাটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে জিরা মসলা উৎপন্ন করা যায় কি না, সেই চেষ্টা করেছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীতাকুণ্ডে এর আগে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ করে রঙিন ফুলকপি, লাউ বেগুন এবং বিটরুট চাষে সফলতা পেয়েছে কৃষি বিভাগ। এখন এই তিনটি ফসলের চাষাবাদে বিস্তৃতি বেড়েছে। একইভাবে বিদেশি ফসল জিরা চাষে সফল হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। সারা দেশে ৪০ জন কৃষককে জিরা চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ইমতিয়াজও সেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে জিরার বীজ দেওয়া হয়।

কৃষক ইমতিয়াজকে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক জিরা চাষ হয়েছে। মূলত পরিবেশ ও মাটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে জিরা মসলা উৎপন্ন করা যায় কি না, সেই চেষ্টা করেছে কৃষি বিভাগ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ অজ্ঞাত রোগে ইমতিয়াজের জিরাখেত আক্রান্ত হয়ে পড়ে। জিরা চাষের গাইডলাইন অনুসারে সম্ভাব্য রোগের নিয়ম মেনে ওষুধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবে জিরাখেত নষ্টের হাত থেকে বাঁচানো যায়নি। রোগের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেটি বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাঁরা রোগ নির্ণয় করে সে রোগের হাত থেকে বাঁচার উপায় বলে দেবেন।’

কৃষি কর্মকর্তা বলেন, আপাতত আগামী বছর আর জিরা চাষ হবে না। এ অঞ্চলের জন্য নতুন করে গাইডলাইন না আসা পর্যন্ত জিরার চাষ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া আর্দ্রতার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা যে সমাধান দেবেন, সেটার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে জিরা চাষ করা হবে।