মিয়ানমারের সশস্ত্রগোষ্ঠীর ছোড়া গুলি টেকনাফের টেকনাফ হোয়াইক্যাং লম্বাবিল তেচ্ছাব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের ঘরে এসে পড়ে। গতকাল বিকেলে
মিয়ানমারের সশস্ত্রগোষ্ঠীর ছোড়া গুলি টেকনাফের টেকনাফ হোয়াইক্যাং লম্বাবিল তেচ্ছাব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের ঘরে এসে পড়ে। গতকাল বিকেলে

কক্সবাজারের টেকনাফ

আতঙ্কে ঘরছাড়া বাসিন্দারা

গত রোববার ঘরের পাশে মাথায় গুলিবিদ্ধ হুজাইফা আফনানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।

কারও ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। কিছু ঘরে শুধু পুরুষ সদস্য থাকলেও পরিবারের অন্যদের পাঠিয়ে দিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার চিত্র এটি।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, এই এলাকার বাসিন্দাদের সবার মধ্যে আতঙ্ক। কখন গুলি এসে পড়ে। সকালেও দুজনের ঘরে গুলি এসে পড়েছে। জানালা বেদ করে ঢুকেছে ঘরে।

গত রোববার সকালে মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে আহত হয়েছে হুজাইফা আফনান (৯) নামের টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লাম্বার বিল এলাকার এক শিশু। সে বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। পরদিন গত সোমবার টেকনাফ সীমান্তের লম্বাবিল এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামের এক মাছচাষি পা হারান। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া সংঘাতের সময় অনুপ্রবেশের দায়ে আটক ৫২ রোহিঙ্গাকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টার শেল ও বোমা বিস্ফোরণ থামছে না। গত বৃহস্পতিবার থেকে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে সরকারি জান্তা বাহিনী। অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে স্থলভাগে সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। এ কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ওপারের বিকট বিস্ফোরণে টেকনাফের গ্রামগুলো কেঁপে উঠছে। ওপার থেকে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে এপারের লোকজনের ঘরবাড়ি, চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে।

আতঙ্কে ঘরছাড়া, ঝুলছে তালা

কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছি ব্রিজ এলাকায় বসবাস করে প্রায় ২০০ পরিবার। সেখান থেকে মিয়ানমার সীমান্তের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। বাসিন্দারা জানান, সীমান্তের এপারে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। সে কারণে দূরত্ব তিন কিলোমিটার হলেও তারা গোলাগুলি করলে আশপাশের বাড়িতে গুলি এসে পড়ছে।

তালা ঝুলতে দেখা গেছে আবুল কালামের ঘরে। তাঁর প্রতিবেশী নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে গুলি এসে পড়ছে তাঁদের ঘরে। প্রতিবেশী এক শিশু মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। এ কারণে আবুল কালাম পরিবার নিয়ে কক্সবাজার সদরে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে গেছেন তিন দিন আগে। নাসিরের ঘর পাকা, তাই ঘরের মালামাল পাহারা দেওয়ার জন্য রয়ে গেছেন। তবে তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যরা এক আত্মীয়ের বাসায় চলে গেছেন।

মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ছোড়া গুলিতে আহত হয় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুজাইফা আফনানের বই হাতে বাবা জসিম উদ্দিন। সীমান্তের কাছাকাছি তাদের ঘর। গতকাল বেলা তিনটায় টেকনাফের হোয়াইক্যাংয়ের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায়

এই এলাকায় তালা ঝুলতে দেখা গেছে আমির হোসেন, আবু তাহের আনোয়ারুল ইসলামসহ অন্তত ৩০টি ঘরে। এর মধ্যে গতকাল সকালে এই এলাকার আবু তাহের ও জোছনা আক্তারের ঘরের জানালা দিয়ে ওপার থেকে আসা দুটি গুলি ঢুকেছে। তবে কেউ হতাহত হয়নি।

স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান শাহজালাল প্রথম আলোকে বলেন, ওপার থেকে আসা গুলির আতঙ্কে অনেকে ঘরে তালা দিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছেন। বাকিরা রয়েছেন আতঙ্কে। এখানকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য সীমান্তে পাহারা জোরদার করা উচিত।

দুশ্চিন্তায় মাছচাষি ও দিনমজুরেরা

গত বৃহস্পতিবার থেকে গোলাগুলি শুরু হওয়ায় ছয় দিন ধরে সীমান্তের পাশে থাকা মাছ ও কাঁকড়াঘেরে যেতে পারছেন না মাছচাষিরা। একই অবস্থা সেখানে কাজ করা দিনমজুরদের।

মাছচাষি রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১২ লাখ টাকায় ইজারা নিয়ে বাগদা চিংড়ির চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে সেখানে আর যেতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে তাঁর সব শেষ হয়ে যাবে।

দিনমজুর রহিম মিয়া মাছের ঘেরে কাজ করেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দৈনিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেতনে মাছ ও কাঁকড়াঘেরে কাজ করেন তিনি। কিন্তু ছয় দিন ধরে গোলাগুলির কারণে যেতে পারছেন না কাজে। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে।

রবিউল ইসলাম ও রহিম মিয়ার মতো অবস্থা টেকনাফ সীমান্তের লাম্বার বিল তেচছি ব্রিজ এলাকার অন্য বাসিন্দাদের।

সরেজমিনে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০ পরিবারের আয়রোজগার বেশির ভাগ মাছ ও কাঁকড়া চাষের ওপর নির্ভরশীল।

গুলিবিদ্ধ মেয়ের বই নিয়ে কাঁদছেন বাবা

গত রোববার লম্বাবিল এলাকায় ঘরের পাশে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয় তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী হুজাইফা আফনান। উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।

গতকাল দুপুরে শিশুটির ঘরে গিয়ে দেখা যায়, তার স্কুলের বই বুকে নিয়ে কাঁদছেন বাবা জসীমউদ্দীন। ঘরভর্তি আত্মীয়স্বজন। এক কক্ষে পড়ানো হচ্ছে শিশুটির রোগমুক্তির জন্য মিলাদ। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিশুটির বাবা বলেন, সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল হুজাইফা। তাকে নিয়ে বাবা ঘরের পাশে দোকানে যান। দোকান থেকে মটরভাজা কিনে দেন। সেটি খেতে খেতে তার মাথায় একটি গুলি এসে লাগে। মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। মেয়ে হুজাইফার জন্য দেশেবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন জসীম।

এর পরদিন গত সোমবার মাছের ঘেরে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে এক পা হারানো হানিফের পরিবার রয়েছে দুশ্চিন্তায়। গতকাল হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম লম্বাবিল এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায় তাঁর বাবা ফজলে করিমকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্তে কেন মাইন থাকবে? এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চান তিনি।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকা ছাড়াও আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তেচছি বাজার এলাকার পাঁচজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তাঁরা নিজেদের আতঙ্কের কথা জানান। গতকাল বিকেলে টেকনাফ উপজেলা সদরের শাপলা চত্বরের সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গোলাগুলি ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্কের বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি বন্ধে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। লোকজন যাতে আতঙ্কিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।