বন্যায় নষ্ট হওয়া পেঁপে বাগানে বসে আহাজারি করছেন কৃষক জয়নাল আবেদীন। গত মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকা থেকে তোলা
বন্যায় নষ্ট হওয়া পেঁপে বাগানে বসে আহাজারি করছেন কৃষক জয়নাল আবেদীন। গত মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকা থেকে তোলা

‘২০ লাখ টাকা খরচ করে শখের বাগান করেছিলাম, বন্যায় শেষ হয়ে গেল’

‘স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছি। মানুষের থেকে ধারদেনা করেছি, ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়েছি। এরপর ২০ লাখ টাকা খরচ করে শখের বাগান তৈরি করেছিলাম, বন্যায় সব শেষ হয়ে গেল। এখন ঋণের ১৫ লাখ টাকা কীভাবে দেব? এ চিন্তা আর শেষ হয় না।’

কথাগুলো বলছিলেন কৃষক জয়নাল আবেদীন (৩৫)। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল এলাকার বাসিন্দা। বাড়ির পাশেই প্রায় আট মাস আগে ছয় একর জমিতে পেঁপে ও বরইগাছের বাগান করেছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি বন্যায় তাঁর বাগানের বেশির ভাগ পেঁপেগাছ মারা গেছে। এসব পেঁপেগাছে সবে ফলন আসা শুরু করেছিল। আর কিছুদিন পরেই এগুলো বাজারে বিক্রি করা যেত।

গত মঙ্গলবার বিকেলে কথা হয় কৃষক জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে। তখন তিনি ঘুরে ঘুরে বাগান দেখছিলেন। বলেন, ‘অনেক ভাবনাচিন্তা ও পরিকল্পনা করে বাগান করেছিলাম। কিন্তু সব ভেস্তে গেল।’

অবশ্য শুধু জয়নাল নন, তাঁর মতো একই অবস্থা কক্সবাজার জেলার ২৩ হাজার কৃষকের। ঋণ ও ধারদেনা করে কেউ বর্গা জমিতে আউশ ধান, কেউ পেঁপে, পেঁয়াজ, আদা, শাকসবজি; আবার কেউ পানের বরজ ও আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। বন্যার পানিতে তাঁদের সবকিছু ভেসে গেছে। অনেক কৃষকেরই নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার সামর্থ্য নেই। তাই আসন্ন আমন ধানের আবাদ নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বছর জেলায় ৭৮ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল। মোট চাষির সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের বেশি। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জুলাই মাসের শুরুতে টানা ৭ দিনের বন্যায় কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলায় কৃষি খাতে অন্তত ৫৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

‘দাদন নিয়ে আউশ ধান চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে বৃষ্টি সব শেষ করে দিল। এখন দেনার টাকা কীভাবে শোধ করব। এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’
—জমির উদ্দিন, কৃষক, পেকুয়া, কক্সবাজার।

মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের মিয়াপাড়ায় গিয়ে কথা হয় কৃষক জমির উদ্দিনের (৪৭) সঙ্গে। তিনি দেড় একর জমিতে আউশ ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু ধান আর ঘরে তুলতে পারেননি। ফসলের ক্ষতি হলেও এখন পর্যন্ত তিনি সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাননি। জমির উদ্দিন বলেন, ‘দাদন নিয়ে আউশ ধান চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছিল। তবে বৃষ্টি সব শেষ করে দিল। এখন দেনার টাকা কীভাবে শোধ করব, এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ সবজি খেত দেখাচ্ছেন এক কৃষক। গত মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী এলাকায়

বন্যায় যত ক্ষতি

বন্যায় কোন খাতে কত ক্ষতি হয়েছে, তার সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ১৯ জুলাই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এ হালনাগাদ করেছেন। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৭ দিনের বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলায় ২৩ হাজার ২৮৪ জন কৃষকের ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া, চকরিয়া, মাতামুহুরী, কুতুবদিয়া ও রামু উপজেলার কৃষকদের। এই পাঁচ উপজেলার বেশ কিছু গ্রামে এখনো বন্যার পানি রয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যায় পেকুয়া উপজেলায় ১ হাজার ১৫০ চাষির ২৫০ হেক্টর, চকরিয়ায় ১ হাজার ২৩১ চাষির ৩২০ হেক্টর ও মাতামুহুরী উপজেলায় ১ হাজার ৩৯৫ চাষির ৬৪০ হেক্টর আউশ ধান নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ার ৪ হাজার ২০ চাষির ৫৬০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলার ৯ হাজার ৫০ জন চাষির ১ হাজার ৭৯৭ হেক্টরের ধান নষ্ট হয়েছে।

জেলার ৮৯৫ হেক্টর আমন ধানের বীজতলার মধ্যে ৪৭০ হেক্টরই নষ্ট হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৫২০ চাষি। পেকুয়া মিয়াপাড়ার কৃষক ছাবের আহমদ (৩৯) বলেন, তিনি ৪০ শতাংশ জমিতে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। টানা বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে পুরোটাই নষ্ট হয়েছে। এখন তিনি চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়েছিল ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বন্যায় ১৪ হাজার ৮০৫ জন কৃষকের ৬৮৪ হেক্টরের ফসল নষ্ট হয়েছে। চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকার কৃষক নুরুল আবসার বলেন, তিনি চার একর জমিতে পেঁপে ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করেছিলেন। বন্যার পানিতে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁর প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা। গত মঙ্গলবার কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মিয়াজিরপাড়া থেকে তোলা

জেলার ৯টি উপজেলায় ৩ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে দুই হাজারের বেশি পানের বরজ রয়েছে। এর মধ্যে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ১৬৬ হেক্টরের বেশি এলাকার শতাধিক বরজ নষ্ট হয়েছে। এ খাতে ২ হাজার ৪৯৪ চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মহেশখালীতে ৯৮০ জন চাষির ৮২ হেক্টর, পেকুয়ায় ১৮০ জন চাষির ২০ হেক্টর এবং টেকনাফে ৪৫০ জন চাষির ৩০ হেক্টর পান নষ্ট হয়েছে।

পেকুয়ার শিলখালী গ্রামের পানচাষি শফিউল আলম বলেন, প্রায় সাত মাস আগে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে একটি বরজ তৈরি করেছিলেন। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে মানসম্মত বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ জলাবদ্ধতা ও অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোয় আমন ধান চাষ শুরু করতে ১৫ থেকে ২০ দিন বিলম্ব হতে পারে। তবে কিছু কিছু এলাকায় আমনের চারা রোপণ শুরু হয়েছে।