‘আমার সব শেষ অই গিছে। আমার পুয়া বিদেশ যাইবার লাগি পাগল আছিল। গেইমে (ছোট নৌকা) তোলার আগে টেকার লাগি দালালে তারে পিঠাইছে। গেইমে খানি নাই, পানি নাই। পুয়াটা পানি পানি কইরা মরছে। খাইবার পানি পাইছে না।’
ভূমধ্যসাগরে ছেলে শায়েক আহমদের (২৩) মৃত্যুতে বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি খেয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন সত্তরোর্ধ্ব আখলুছ মিয়া। একইভাবে আহাজারি করছিলেন তাঁর দুই ফুপু শেলি বেগম ও হেনা বেগমও।
আজ রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে ৫৪ কিলোমিটার দূরে জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা যায়।
শুধু শায়েক আহমদ একা নন, লিবিয়া থেকে ছোট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জন। সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই তরুণ। গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তাঁরা। সাগরে পথ হারিয়ে ছয় দিন ছিলেন। অনাহারে তাঁরা মারা যান। পরে সঙ্গীরা লাশ ভাসিয়ে দেন সাগরে। শুক্রবার গ্রিস উপকূল বোটে থাকা জীবিতদের উদ্ধার করে সে দেশের কোস্টগার্ড।
আখলুছ মিয়া বলেন, তাঁর ছেলে শায়েক এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে এলাকার দালাল আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে গ্রিসে যেতে চার মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। এ জন্য প্রথমে দালালকে সাড়ে চার লাখ টাকা দেন তিনি। এরপর সৌদি আরব, কুয়েতসহ আরও কয়েক দেশ ঘুরে লিবিয়া পৌঁছান। লিবিয়া থেকে দালাল আজিজুল জানান, এখন গ্রিসের গেমে শায়েককে তোলার আগে আরও সাড়ে ৭ লাখ টাকা দিতে হবে। তিনি জমি, গরু বিক্রি করে সেই টাকা দেন। কিন্তু প্রথম দিন শায়েক নৌকায় উঠতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান, তাই যেতে পারেনি। এরপর ২১ মার্চের গেমে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়। শনিবার গ্রিসে থাকা এলাকার আরেক তরুণ সোহেল আহমদ ফোন করে শায়েকের মৃত্যুর বিষয়টি জানান।
সোহেলের বরাত দিয়ে শায়েকের চাচা আঙ্গুর মিয়া বলেন, সাগর থেকে জীবিত উদ্ধার ব্যক্তিদের দেখতে ক্যাম্পে গিয়ে শায়েকের খোঁজ নেন সোহেল। তখন অন্যরা জানান নৌকায় খাবারের অভাবে অনেকেই মারা গেছেন। এর মধ্যে শায়েকও ছিলেন। নৌকায় দুদিন লাশ রাখার পর সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। আঙ্গুর মিয়া বলেন, নৌকায় এক দিন পরই খাবার ও বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে যায়। ২৪ ঘণ্টার খাবার দিয়ে এসব নৌকা ছাড়া হয়। কিন্তু নৌকাটি পথ হারানোতে খাদ্যসংকটে পড়েন সবাই।
শায়েকের ফুপু হেনা বেগম কাছে যাঁকেই পাচ্ছিলেন তাঁকে ধরেই শায়েকের লাশটা এনে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মা নাই পুয়া। আমরারে লাশটা আইন্না দেও। সোনার চানের মুখটা দেখি। না খাইয়া পুয়াটা মরছে। শুনছি খালি পানি পানি করছে। একফোঁটা খাইবার পানি পাইছে না। হায়রে হায়...।’
প্রতিবেশীরা জানান, আখলুছ মিয়া দীর্ঘদিন কুয়েতে ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। শায়েক সবার বড়। সামান্য জমি আছে। এই জমি চাষাবাদ করেই চলেন। টানাপোড়েনের সংসার। শায়েকই ছিলেন ভরসা। এখন সাগরে সব শেষ হয়ে গেছে।
দুপুরের পরে ওই বাড়িতে যান স্থানীয় রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখ ছদরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার ইউনিয়নেই দুজন মারা গেছে। দুজনই তরুণ। পরিবারগুলো কীভাবে সহ্য করবে।’
বাড়িতে গিয়ে আখলুছ মিয়াকে সান্ত্বনা দেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, ‘লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে এই উপজেলার পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আমি সবার বাড়িতে যাচ্ছি। তাদের খোঁজখবর নিচ্ছি। একই সঙ্গে দালালদের তালিকা করা হচ্ছে। এই তালিকা পুলিশকে দেওয়া হবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।’