চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জমে ওঠে গ্রামের মানুষের আড্ডা ও বিনোদনের আসর। সম্প্রতি পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া বাজারে
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জমে ওঠে গ্রামের মানুষের আড্ডা ও বিনোদনের আসর। সম্প্রতি পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া বাজারে

চা আর টিভিতে জমে ওঠে গ্রামীণ সন্ধ্যা

দিনভর মাঠে কাজ শেষে সন্ধ্যা নামতেই পাবনার বেড়া উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের আবুল কালাম ছুটে আসেন স্থানীয় হাটুরিয়া বাজারের আবদুর রউফের চায়ের দোকানে। দোকানটা বেশ বড়, ভেতরে সারি সারি বেঞ্চ পাতা। বেঞ্চগুলোর সামনেই রয়েছে বড় পর্দার টিভি। সেই টিভিতে সন্ধ্যা থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত সেখানে বসে তিনি সিনেমা, নাটক কিংবা গান দেখেন। টিকিট লাগে না, তবে শর্ত একটাই—মাঝেমধ্যে এক কাপ চা পান করতেই হবে। আবুল কালামের মতো অসংখ্য মানুষ এই দোকানেই খুঁজে নিয়েছেন ক্লান্ত দিনের শেষে একটু বিনোদন।

শুধু আবদুর রউফের চায়ের দোকানই নয়, বেড়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলে রয়েছে এ ধরনের শতাধিক টিভি বসানো চায়ের দোকান। টিভি থাকার কারণে এসব দোকানে যেমন দেদার চা বিক্রি হয়, তেমনি গ্রামীণ লোকজনও বিনোদনের জায়গা খুঁজে পান।

একসময় গ্রামের বিনোদন মানেই ছিল জমিদারবাড়ির গানের আসর, কিংবা মেলা-যাত্রাপালার আয়োজন। শীতের রাতে পাড়ার খোলা চত্বরে অথবা কোনো বাড়ির বড় উঠানে হতো পুঁথিপাঠ বা পালাগান। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ভিড় জমাত সেসব আসরে। আধুনিক প্রযুক্তি আর মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে সেই আসরগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন সেই জায়গা দখল করছে বাজারের চায়ের দোকান। প্রতিটি দোকানেই বড় আকারের এলইডি টিভি ঝুলছে। কোথাও সিনেমা, কোথাও নাটক, আবার কোথাও জনপ্রিয় গান বা কমেডি দৃশ্য চলছে। কখনো কখনো ডিশ লাইনে খবরও দেখানো হয়। দর্শকেরা মনোযোগ দিয়ে দেখেন, আর দোকানিরা ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর হাজির হন ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে।

হাটুরিয়া বাজারের চায়ের দোকানি আবদুর রউফ বলেন, আগে দোকানে দিনে ৭০-৮০ কাপ চা বিক্রি হতো। এখন টিভি লাগানোর পর দিনে ৩০০ কাপের বেশি চা বিক্রি হয়। মানুষ শুধু চা খেতে নয়, সময় কাটাতেও আসে।

বেড়ার পেঁচাকোলা গ্রামে চা বানাতে ব্যস্ত দোকানি। ভেতরে টিভিতে অনুষ্ঠান দেখছেন স্থানীয় লোকজন

বেড়া পৌর এলাকার কলেজশিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বেড়া উপজেলাসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে কোনো সিনেমা হল নেই। নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও তেমন হয় না। এ ছাড়া দরিদ্র ও দিনমজুর শ্রেণির অনেকের বাড়িতে কোনো টিভিও নেই। তাই চায়ের দোকানে অন্তত একটু হলেও মজা পাওয়া যায়। এই প্রথা যেমন দোকানিদের ব্যবসা বাড়িয়েছে, তেমনি মানুষেরও সময় কাটছে আনন্দে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার বেড়া উপজেলা সদর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে কয়েক শ চায়ের দোকান। এর মধ্যে সংখ্যায় বেশি হলো ছোট আকারের টং দোকান। এসব দোকানে টিভি থাকে না, বসার জায়গাও খুব সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দাঁড়িয়েই চা পান করতে হয়। তবে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে রয়েছে শতাধিক বড় আকারের চায়ের দোকান, যেগুলোতে ঝুলছে এলইডি টিভি। এসব দোকানের ভেতরে কয়েক সারি বেঞ্চে বসে একসঙ্গে বহু মানুষ চা খেতে খেতে সিনেমা, নাটক কিংবা খবর দেখতে পারেন। এই দোকানগুলো স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু আড্ডার জায়গাই নয়, বরং গ্রামীণ বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ১০টি টিভি বসানো চায়ের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সকালে, দুপুরে বা বিকেলেও কেউ কেউ ভিড় করেন, তবে আসল ভিড় জমে সন্ধ্যার পর। বেঞ্চগুলোতে তখন জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

যমুনা নদীর পাড়ে পেঁচাকোলা নৌঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাঁচ-ছয়টি চায়ের দোকান থাকলেও টিভি বসানো চায়ের দোকান রয়েছে দুটি। সন্ধ্যার পর দুটি দোকানেই জমজমাট দেখা গেল। এর মধ্যে সোহেল রানার চায়ের দোকানে আসা স্থানীয় প্রবীণ রমজান আলী বলেন, ‘আমাদের সময়ে রাতে পালাগান, যাত্রাপালা হতো। এখন সেসব আর নেই। চায়ের দোকানেই সবাই জড়ো হয়। এটা এখন গ্রামের নতুন মেলা।’

সোহেল রানা বলেন, ‘নদীর পাড়ে সন্ধ্যার পর মানুষের তো বিশেষ কোনো বিনোদন থাকে না। তাই দোকানে টিভি বসানোর পর থেকে ভিড় বেড়েছে অনেক। তবে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষ একসঙ্গে বসে গল্প করে, সিনেমা-নাটক দেখে—এটা দেখে আমারও ভালো লাগে। এত মানুষের আসা-যাওয়ায় আমিও নতুন অনেক খবরাখবর জানতে পারি।’

গ্রামের হারিয়ে যাওয়া পালাগান, যাত্রা কিংবা মেলার জায়গা পুরোপুরি না হলেও অনেকটা দখল করে নিয়েছে চায়ের দোকানের টিভি। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের সঙ্গে সন্ধ্যার এই ছোট্ট আসরই এখন অনেক গ্রামীণ মানুষের বিনোদন, আড্ডা আর মিলনের নতুন ঠিকানা।