
পুরোনো পেঁপেগাছ ভেঙে গায়ের ওপর পড়লে আহত হন তপতী রানী। ওই দুর্ঘটনার পাশাপাশি তাঁর জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায় গ্রামের বেহাল সড়ক। কর্দমাক্ত সড়ক দিয়ে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাঁশে ঝোলানো প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে ষাটোর্ধ্ব ওই নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন তাঁর ছেলে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে এ দৃশ্য দেখা যায় দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ২ নম্বর কাটলা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী খিয়ারমামুদপুর গ্রামে। আহত তপতী রানী ওই গ্রামের ধীমান বসাকের স্ত্রী।
তপতী রানীর পরিবার ও প্রতিবেশী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালে বাড়ির ভেতরে গৃহস্থালি কাজ করছিলেন তপতী রানী। হঠাৎ বাড়ির একটি পুরোনো পেঁপেগাছ ভেঙে তাঁর ওপর পড়ে। এতে তিনি কোমরে ও বাঁ পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পান। বাড়ির লোকজন তাঁকে উদ্ধার করেন।
এ রাস্তা দিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়, ভাই। হামার মায়োক (মা) এই রাস্তা দিয়ে নিতে কী যে কষ্ট হলো, তা ওপরওয়ালা জানে আর আমি জানি।উত্তম বসাক, তপতী রানীর ছেলে
খিয়ারমামুদপুর গ্রামের সড়কটি চলাচলের অবস্থায় নেই। বর্ষায় কাদা–পানিতে একাকার হয়ে আছে। ভ্যান বা অন্যান্য গাড়ি চলাচল তো দূরের কথা, ওই সড়ক দিয়ে হাঁটাও কষ্টকর। ফলে তপতী রানীকে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে নিতে পারছিলেন না স্বজনেরা। উপায় না পেয়ে বাঁশের সঙ্গে দড়ি দিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার বেঁধে সেই চেয়ারে বসানো হয় তপতী রানীকে। তারপর তাঁর বড় ছেলে গৌতম বসাক ও ছোট ছেলে উত্তম বসাক তাঁকে কাঁধে নিয়ে আধা কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পার হয়ে স্থানীয় বাজারে পৌঁছান। সেখান থেকে ইজিবাইকে করে তপতী রানীকে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
উত্তম বসাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ রাস্তা দিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়, ভাই। হামার মায়োক (মা) এই রাস্তা দিয়ে নিতে কী যে কষ্ট হলো, তা ওপরওয়ালা জানে আর আমি জানি। রাস্তাত খুবই কাদা। একে তো লাল মাটি, তার ওপর রাস্তা দিয়ে জমি চাষ করা ট্রাক্টর যায়, পাওয়ার ট্রিলার যায়, রাস্তা এক্কেবারে নষ্ট হইছে। হাটে আসার উপায় নাই। এই তনে হামরা দুই ভাই মিলে মায়োক বাঁশোত দড়ি বান্ধে চেয়ার বসে কান্ধোত (কাঁধ) করে এই রাস্তা পার করিছি।’
সরেজমিন দেখা যায়, সীমান্তঘেঁষা খিয়ারমামুদপুর গ্রামের প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটারের পুরোটার অবস্থা একই রকম। পিচ্ছিল কাদার কারণে ওই গ্রামের মানুষদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাঁরা কোনো পণ্য আনা–নেওয়া করতে পারছেন না। স্থানীয় লোকজন জানান, প্রতি বর্ষাতেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসব কাদা শুকনা মৌসুমে পরিণত হয় ধুলাবালুতে।
গ্রামের বাসিন্দা সাহেরা বেগম ধাত্রী হিসেবে কাজ করেন। এই বেহাল সড়ক প্রসূতি নারীদের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো নারীর প্রসবব্যথা উঠলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে খারাপ রাস্তার কারণে সেটি সম্ভব হয় না। এ ছাড়া খারাপ রাস্তার কারণে এই গ্রামে কেউ ছেলেদের বিয়েও করাতে চায় না।
খিয়ারমামুদপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপির ২ নম্বর কাটলা ইউনিয়ন শাখার সহসভাপতি গোলজার রহমান বলেন, খিয়ারমামুদপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। সড়কটি অনেক অবহেলিত, চলাচলের খুবই সমস্যা হচ্ছে। সড়কটি পাকা করার জন্য উপজেলায় বিএনপির নেতাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। সড়কটি পাকা করার বিষয়ে তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন।
স্থানীয় ইউপির শুকুর আলী প্রথম আলোকে জানান, রাস্তাটি পাকা করার জন্য ২০২২ সাল থেকে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলীকে জানিয়েছেন। তাঁরা রাস্তাটি হবে হবে বলে কয়েক বছর পার করেছেন। এবার সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে জানানো হয়েছে। তিনি পাকা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিরামপুর উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী সুরুজ্জামান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, বিরামপুর উপজেলার প্রায় ১০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাকা করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে খিয়ারমামুদপুর গ্রামের রাস্তাটিও রয়েছে। তবে প্রস্তাবটি এখনো সংশ্লিষ্ট দপ্তর অনুমোদন করেনি। অনুমোদন হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিক রাস্তাটি পাকা করা হবে।