কক্সবাজারের ইনানীতে গ্যাসের আগুন পর্যবেক্ষণ করেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। শুক্রবার রাতে
কক্সবাজারের ইনানীতে গ্যাসের  আগুন পর্যবেক্ষণ করেন  পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। শুক্রবার রাতে

কক্সবাজারের ইনানী

গ্যাসের আগুন জ্বলছেই, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা পেট্রোবাংলার

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস থেকে জ্বলে ওঠা আগুন টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। গ্যাসের নির্গমন বন্ধ না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ বর্গমিটার এলাকায় জনসাধারণের চলাচল সীমিত রাখতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) উচ্চপর্যায়ের একটি দল। গ্যাসের আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর উৎস ও মজুত সম্পর্কে ধারণা পেতে সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা।

দলের নেতৃত্ব দেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদিরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।

পরিদর্শন শেষে রাতে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের উৎস ভূগর্ভের অগভীর কোনো গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে ইনানীতে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

মো. শোয়েব আরও বলেন, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর আগুনের শিখার উচ্চতা বেড়েছে বা একই রকম রয়েছে বলে দেখা গেলে আগুন নেভাতে প্রাথমিকভাবে একটি রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিলিফ কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের নির্গমন বন্ধের চেষ্টা করা হবে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা বলেন, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূগঠনে কিছু পরিবর্তনের কারণে এভাবে গ্যাস নির্গমন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ চালাবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে সেখানে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পর্যবেক্ষণের মধ্যে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় একটি সভা হয়। সভায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। বিষয়টি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে উচ্চপর্যায়ের দলটিকে ইনানীতে পাঠানো হয়।

চার দিন ধরে জ্বলছে আগুন, ১৪৪ ধারা জারি

গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ খননের সময় গ্যাস বেরিয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। শুক্রবার রাত ১১টা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন।

আগুন চার দিনেও নেভেনি। জননিরাপত্তায় সড়কে প্রতিবন্ধকতা দেওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে

দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় তা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মেরিন ড্রাইভ ও ছোট সেতু এলাকায় ভিড় করছেন। জননিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত ২০০ বর্গমিটার এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন। এর পরও আগুন দেখতে সেখানে মানুষের ভিড় হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, নানা চেষ্টা করেও নলকূপ থেকে নির্গত গ্যাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে রয়েছে। শুক্রবার সকালেও বাপেক্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল আগুনের পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সভা করে। বাপেক্স প্রশাসনকে একটি নির্দেশনা দিয়েছে। সে অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত ২০০ বর্গমিটার এলাকায় লোকসমাগম নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত ১৪৪ ধারা জারির আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ আদেশ কার্যকর থাকবে। ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বাপেক্সের একটি কারিগরি দল স্থানটি পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, ২৭ অক্টোবর সকালে নলকূপে আগুন জ্বললেও বিকেল পাঁচটার পর থেকে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। শুক্রবার রাত ১১টা পর্যন্ত আগুনের তীব্রতা একই রকম ছিল। এর আগে বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। স্থানীয় লোকজনও আগুন নেভানোর কাজে সহযোগিতা করেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের নির্দেশনা হলো, মাটির নিচের গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে।