
নওগাঁ শহরের আনন্দনগর এলাকার আছিয়া বেওয়া (৭০)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছিয়া ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। টিসিবির ট্রাক থেকে কম দামে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর কিনতে লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ট্রাকের পেছনে তখন অন্তত চার শ মানুষ। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকবার সারি থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর জায়গা হয় সারির পেছনে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে অন্যদের সঙ্গে আনন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অপেক্ষা করছিলেন আছিয়া বেওয়া। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন পুলিশ এসে অপেক্ষমাণ লোকজনদের জানায়, টিসিবির ট্রাক আসবে আনন্দনগর খেলার মাঠে। খবর পেয়ে অপেক্ষমাণ লোকজন হুড়মুড় করে বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে খেলার মাঠে ছোটেন।
ট্রাকের পেছনে মেয়েদের সারিতে দাঁড়ানো আছিয়া বেওয়া বলেন, ‘জোয়ান মহিলারা হামাক ধাক্কা ম্যারে ফেলে দ্যাছে। শ্যাষে বাধ্য হয়ে লাইনের পিছনত দাঁড়াছি। হামি ট্রাকের কাছত য্যাতে য্যাতে জিনিস থাকবে কি না, আল্লাই জানে। হামি অসুস্থ মানুষ, তাও কেউ অ্যানা সুযোগ দ্যাছে না।’
রোজা উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির দ্বিতীয় দিনে আজ বেলা একটার দিকে নওগাঁ শহরের আনন্দনগর খেলার মাঠে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি শুরু করা হয়। সেখানে টিসিবির পণ্য নিতে এসে বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন নওগাঁ শহরের একটি পয়েন্টে ট্রাকে করে তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর বিক্রি করা হচ্ছে। এবার প্রতিটি ট্রাক থেকে একসঙ্গে ৪০০ জন সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারছেন। গত বছর নওগাঁ পৌর এলাকায় প্রতিদিন ৫টি পয়েন্টে ৪০০ জনের কাছে পণ্য বিক্রি করা হয়েছিল। লম্বা বিরতি দিয়ে পণ্য বিক্রি করায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ বেশি ভিড় করছেন।
টিসিবি সূত্র জানায়, প্রতিটি ট্রাক থেকে ৫৯০ টাকায় ৫ ধরনের পণ্যের প্যাকেজ বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর। প্যাকেজের সব পণ্য একসঙ্গে নিতে হচ্ছে।
হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করায় বৃদ্ধা আছিয়ার মতো বিপদে পড়েন টিসিবির পণ্য নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব মনোয়ারা বেগম নামের আরেক নারী। তিনি বলেন, ‘ট্রাকের লোকগুলার কাণ্ডজ্ঞান নাই। সকাল ১০টা থ্যাকে শুনোছি স্কুল মাঠত জিনিস বিক্রি করবে। সে জন্য জিনিস কিনার জন্য সকাল ৭টা থেকে মাঠত অ্যাসে বসে আছিনু। দুপুরে অ্যাসে কছে এই মাঠত লয়, খেলার মাঠত ট্রাক অ্যাসবে। সবাই দৌড়ে খেলার মাঠত অ্যালু। কিন্তু হামি অসুস্থ মানুষ ধীরে ধীরে আসতে লাইনের পিছনত পড়ে গেছি।’
লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জুলেখা বেগম নামের আরেক নারী বলেন, ‘কাজকাম ফ্যালে দিয়ে হামরা সকাল থেকে বসে আছিনু। আর এখন পিছ থ্যাকে আসে এখন অনেকেই সামনে দ্যাঁড়ে গেছে। হামরা তো ওদের মতো ধাক্কাধাক্কি করতে পারমু না।’
প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর অনেক কষ্টে পণ্য পান শহরের শাহী মসজিদ এলাকার বাসিন্দা গুলেনুর বেগম। তিনি বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে জিনিস বিক্রি শুরু করার কথা। কিন্তু ট্রাকই আসিছে বেলা একটার পর। বিক্রি শুরু করেছে দেড়টার পর। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় থাকার পর জিনিস পাইলাম।’
খবির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘গতবার রোজায় টিসিবির জিনিস বিক্রির আগে সবার হাতে হাতে সিরিয়াল অনুযায়ী স্লিপ দিয়ে দিত। এবার সেটা করেনি। এ কারণে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। ধাক্কাধাক্কি করে লাইনে যে আগে দাঁড়াতে পারছে, সেই আগে পণ্য পাচ্ছে।’
জানতে চাইলে টিসিবির ডিলার ও মেসার্স অবন্তিকা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তারক চক্রবর্তী বলেন, প্রতিদিন টিসিবির বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পণ্য নিয়ে আসতে হয়। বগুড়া থেকে ট্রাক আসতে আসতে দুপুর হয়ে যায়। এ জন্য সকাল ১০টা থেকে বিতরণ করার কথা থাকলেও দেরি হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিয়াম স্কুলের সামনের মাঠে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে ৪০০ জনকে পণ্য বিক্রি করেছি। কিন্তু মানুষ এসেছিল ৬০০-এর বেশি। আজকে আনন্দনগর খেলার মাঠেও ৪০০ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকায় বিশৃঙ্খলাটা হচ্ছে। গতবারের মতো একসাথে চার-পাঁচটা পয়েন্টে পণ্য বিক্রি করা গেলে এত চাপ হতো না। মানুষ শান্তিমতো পণ্য কিনতে পারতেন।’