খ্রীস্টিয়ান সার্ভিস সোসাইটি নির্বাহী পরিচালক (ইডি) রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী
খ্রীস্টিয়ান সার্ভিস সোসাইটি নির্বাহী পরিচালক (ইডি) রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী

সাক্ষাৎকার: রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী

উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে

খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) খ্রীস্টিয়ান সার্ভিস সোসাইটি (সিএসএস)। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই রেভারেন্ড পল মুন্সীর হাত ধরে সংস্থাটি যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৫ সালে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী। খুলনা থেকে পরিচালিত হলেও সিএসএসের কার্যক্রম বর্তমানে দেশের ২৯টি জেলায় বিস্তৃত। সংস্থাটি ২২২টি শাখার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সদস্যের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এনজিও খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সিএসএসের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উত্তম মণ্ডল

প্রশ্ন

বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলো অর্থায়ন (ফান্ডিং) সংকটে ভুগছে। অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও সংকুচিত হচ্ছে। কারণ কী বলে মনে করেন?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: বাংলাদেশের এনজিও খাত একটি পরিবর্তনের সময় পার করছে। আগে আন্তর্জাতিক সহায়তার বড় অংশ আসত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা সামাজিক উন্নয়নে। এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকার বদলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, আফ্রিকার সুদানসহ বিভিন্ন দেশের মানবিক পরিস্থিতি—এসব কারণে অনেক উন্নয়ন অর্থায়ন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিগত অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশও আর আগের জায়গায় নেই। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ফলে অনেক দাতা এখন বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে দেখছেন। ফলে অর্থায়ন কমেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে। হ্যাঁ, বাংলাদেশের উন্নয়ন খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে আমরা শুধু সংকট হিসেবে দেখি না; বরং এটি নতুনভাবে কাজ করার, নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এবং স্থানীয় সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ।

প্রশ্ন

ইউএসএইড বাংলাদেশ থেকে কার্যত মুখ গুটিয়ে নিয়েছে (রোহিঙ্গা ইস্যু বাদে)। এটি উন্নয়ন খাতের জন্য বড় ধাক্কা। সামনে অর্থায়নের সুযোগ কি আরও কমবে, নাকি পরিস্থিতিতে কিছুটা ভারসাম্য ফিরবে?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: স্বল্প মেয়াদে চ্যালেঞ্জ থাকবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা শেষ হয়ে যাবে; এমনটা নয়। বরং অর্থায়নের ধরন বদলাবে। আগে প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থায়ন বেশি ছিল। এখন দাতারা দেখতে চান; একটি প্রতিষ্ঠান কতটা টেকসই, স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তাই এখন সময় এসেছে এনজিওগুলোর শুধু বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভর না থেকে সামাজিক উদ্যোগ, করপোরেট পার্টনারশিপ, সরকারি সহযোগিতা ও দেশীয় সম্পদ সংগ্রহের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার।

প্রশ্ন

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেকে কাজ করছে, কাজের অনেক সুযোগও আছে। এখানে অনুদান পাওয়া জরুরি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তো অর্থায়ন আমাদের ন্যায্য অধিকার। অথচ জলবায়ু খাতেও অর্থায়ন কমছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার; জলবায়ু অর্থায়ন কোনো দয়া নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন; যেটাকে বলে ক্লাইমেট জাস্টিস (জলবায়ু ন্যায্যতা)। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ অত্যন্ত সামান্য। কিন্তু ক্ষতির বড় অংশ আমাদেরই বহন করতে হয়। বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি পৌঁছায় না। আমার মনে হয়, যেসব মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদেরই থাকা উচিত।

প্রশ্ন

জলবায়ু খাতে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পাওয়া উচিত, সেটা আমরা কতটা পাচ্ছি? জলবায়ু খাতে ফান্ডিংয়ের ন্যায্যতা নিশ্চিত হচ্ছে কি না?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় আমরা এখনো পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন পাচ্ছি না। প্রথমত, অভিযোজন বা অ্যাডাপ্টেশনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখানেই। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান রাজধানীতে বসে করা যাবে না। যাঁরা প্রতিদিন লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা খরার সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন

জলবায়ু খাত নিয়ে উন্নয়ন সংস্থা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় কতটা জরুরি? সমন্বিতভাবে আমরা এগোতে পারছি কি না?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একক প্রতিষ্ঠান মোকাবিলা করতে পারবে না। সরকার নীতি দেবে, উন্নয়ন সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা দেবে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান তথ্য দেবে, আর বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসবে। এই সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, মানুষের কাছে ফল তত দ্রুত পৌঁছাবে।

প্রশ্ন

সিএসএস প্রতিষ্ঠার একেবারেই শুরুর দিকে জলবায়ু-সহায়ক কৃষি নিয়ে কাজ করেছে, প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। কিন্তু এখন জলবায়ু খাতে তেমন কোনো কাজ নেই। ভবিষ্যতে কাজ করার পরিকল্পনা আছে কি না?

রেভারেন্ড মার্ক মুন্সী: সিএসএসের ইতিহাস দেখলে বোঝা যাবে, মানুষের প্রয়োজন যেখানে সবচেয়ে বেশি, আমরা সেখানেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ এবং উপকূলীয় মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, জীবিকা/উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ উন্নয়নের মতো বিভিন্ন খাতে কাজ করছি। এগুলোর অনেকগুলোই বাস্তবে মানুষের জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
আমরা বিশ্বাস করি, জলবায়ু মোকাবিলায় অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আমরা জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস, টেকসই জীবিকা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কমিউনিটি রেজিলিয়েন্সের মতো বিষয়ে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী।