সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছে শিক্ষার্থী নাদিয়া বেগম। শনিবার সকালে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে
সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছে শিক্ষার্থী নাদিয়া বেগম।  শনিবার  সকালে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে

সুনামগঞ্জে জিপিএ-৫ সংবর্ধনা

‘বাবা আমার মোটিভেশনাল স্পিকার, নতুন নতুন স্বপ্ন দেখান মা’

‘৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। অনেক দিনের ইচ্ছা পূরণ হলো আজ। এখন আমার চোখে মা-বাবার মুখ ভাসছে। এ অর্জনের পেছন তাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বাবা প্রতিদিন আমাকে প্রেরণা দেন। তিনি আমার মোটিভেশনাল স্পিকার, মা প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখান। ছোট্ট অর্জনে এত বড় সম্মান পাচ্ছি। ধন্যবাদ, প্রথম আলো; ধন্যবাদ, শিখো।’

আজ শনিবার সুনামগঞ্জে ‘শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে নাদিয়া বেগম। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নাদিয়া বেগম এসেছিল জেলার ছাতক উপজেলা থেকে। সে ছাতকের মঈনপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ক্রেস্ট হাতে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। শনিবার দুপুরে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে

‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সুনামগঞ্জের পর্বের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

এবারের আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। শনিবার দুপুরে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে

আজ সকালটা ছিল রোদ ঝলমলে। একসময় শুরু হয় ভ্যাপসা গরম। এর মধ্যেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে। কারও কারও সঙ্গে এসেছেন অভিভাবকেরা। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন প্রাঙ্গণ। শিক্ষার্থীরা সারি বেঁধে ক্রেস্ট, স্ন্যাকস ও উপহারসামগ্রী নেয়। প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোনে নানা ধরনের খেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতে নেয় কেউ কেউ। অনেকে প্রিয়জন ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে ফটো বুথে ভিড় করে।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বন্ধুসভার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। আলোচনা পর্বে অতিথি হিসেবে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহাদত হোসেন, সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে আজাদ, সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি কানিজ সুলতানা।

সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানস্থলে ছবি তুলছে একদল শিক্ষার্থী। শনিবার সকালে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তন প্রাঙ্গণে

সুনামগঞ্জ বন্ধুসভার সভাপতি সৌরভ সরকারের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান। শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পাঠ করান বন্ধুসভার উপদেষ্টা মোহাম্মদ রাজু আহমেদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিলেটের প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ, বন্ধুসভার উপদেষ্টা দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয় নাদিয়া বেগম ও তাসনিম সরকার ইমামিম।

অধ্যক্ষ শাহাদত হোসেন বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়া চূড়ান্ত সফলতা নয়; চূড়ান্ত সফলতা মানবিক মানুষ হওয়া, সৃজনশীল মানুষ হওয়া। দেশকে গড়তে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক মানুষ হতে হবে। জীবনে চূড়ান্ত সফলতার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পরিশ্রম করলেই সফলতা আসবে।

সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহাদত হোসেন। শনিবার সকালে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে

কানিজ সুলতানা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। বন্ধু নির্বাচনেও সচেতন হতে হবে। ভালো বন্ধু ভালো কাজে সহযোগিতা করবে। খারাপ সঙ্গ অনেক সময় জীবনকে হতাশা ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তাই সব সময় ভালোর সঙ্গে থাকতে হবে।

সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে আজাদ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রত্যেক শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখব তোমাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে কি না। এ তিনটি বিষয় তোমাদের সামনে এগিয়ে নেবে। দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি যে ঋণ আছে, সেটি মনে রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার পেছনে সাধারণ মানুষের অর্থ আছে।’

সুনামগঞ্জে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নৃত্যম নৃত্যালয়ের নৃত্য পরিবেশন। শনিবার সকালে শহরের হাছন রাজা মিলনায়তনে

সাংবাদিক সুমনকুমার দাশ শুরু করেন সুনামগঞ্জের ৭১ বয়সী সহজ-সরল লস্কর আলীর গল্প দিয়ে। লেখাপড়া না জানা মানুষটি ৪৫ বছর ধরে ঘোড়ার ঘানিতে খাঁটি শর্ষের তেল তৈরি করছেন। তাঁর সংকল্প ছিল তেলে কখনো ভেজাল দেবেন না।

সুমনকুমার দাশ বলেন, ‘আজ আমরা যাদের সংবর্ধনা দিচ্ছি, তারাও সততা, দক্ষতায় সফল মানুষ হবে, এটাই প্রত্যাশা করি। তোমাদের পাশে সব সময় প্রথম আলো থাকবে।’

অনুষ্ঠানের শেষ দিকে অনলাইন কুইজে বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীকে বই উপহার দেওয়া হয়। বন্ধুসভার সদস্য, সংবর্ধিত শিক্ষার্থী, স্থানীয় নৃত্যম নৃত্যালয় ও স্পন্দনের শিল্পীরা গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন।