
প্রবহমান নদীর স্রোত যেমন থামে না, তেমনি থেমে নেই বাবুল হোসেনের জীবন। এক ঘাট থেকে আরেক ঘাট, এক লঞ্চ থেকে আরেকটিতে—নৌপথই তাঁর ঠিকানা, এ পথেই তাঁর জীবিকা।
প্রায় চার দশক ধরে লঞ্চে ও ঘাটে ঘুরে যাত্রীদের জুতা সেলাই করেন বাবুল হোসেন (৫৫)। একই সঙ্গে জুতায় কালি লাগানো ও ছিঁড়ে যাওয়া জুতা মেরামতও করেন। দিনে দিনে তাঁর বয়স বেড়েছে, শরীর আগের মতো সায় দেয় না। তবু থেমে নেই তাঁর এই টিকে থাকার লড়াই।
গত মঙ্গলবার রাতে বরিশাল নদীবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমভি সুন্দরবন-১৬ নামের লঞ্চটি। সেখানে যাত্রীদের ভিড়ে নিচতলার ডেকে দেখা হয় বাবুলের সঙ্গে।
বাবুলের নির্দিষ্ট কোনো দোকান নেই। লঞ্চের ডেকই তাঁর কর্মস্থল। কখনো এ প্রান্তে, কখনো ও প্রান্তে—একটি ছোট বাক্স হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। কেউ ডাক দেন, ‘চাচা, জুতাটা একটু দেখবেন?’ কেউ বলেন, ‘মামা জুতাটা একটু পলিশ লাগবে’—বাবুল একগাল হাসি ছড়িয়ে তাঁদের কাছে যান। ক্লান্তি ভুলে মন দেন কাজে।
বাবুলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁর গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরের এম বালিয়াতলী ইউনিয়নে। মা যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স মাত্র পাঁচ। বাবার জমিজমা ছিল সামান্য। এর মধ্যে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় অনাদর-অবহেলায় বেড়ে উঠতে থাকেন। ১০-১২ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বরগুনা-বরিশালগামী লঞ্চে শুরু করেন জুতা মেরামতের কাজ। বয়স চল্লিশ পেরোনোর পর বাবুল এখন থিতু হয়েছেন বরিশাল-ঢাকাগামী লঞ্চে।
বরগুনার গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে দুই ছেলে তিন মেয়ের সংসার বাবুল হোসেনের। অনেক কষ্টে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে বাসের চালক এবং ছোট ছেলে পড়ছে মাদ্রাসায়। ছোট ছেলের লেখাপড়াসহ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন নিজের আয়েই। এখন বাবুলের ঘর হলেও সেখানে ফেরা হয় খুব কম। লঞ্চই তাঁর ঘরবাড়ি। দিন-রাত, ঝড়-বৃষ্টি, গরম-শীত—সবকিছুকে সঙ্গী করে চলছে তাঁর জীবন-জীবিকা। লঞ্চ ঘাটে ভিড়লে স্টাফদের কেবিনে মালামাল রেখে ডেকেই শুয়ে একবেলা ঘুমিয়ে নেন। মাথার নিচে কখনো নিজের হাত, কখনো ছোট্ট বাক্সটাই বালিশ হয়ে ওঠে।
বাবুলের কোনো দিন ৭০০ টাকা আয় হয়, আবার কোনো দিন ২০০-৩০০ টাকাও ওঠে না। অনেক দিন এমনও গেছে—সারা দিন কাজ করেও খরচটাই ওঠেনি। তবু তাঁর থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, তিনি থামলেই তাঁর ঘরে হয়তো জ্বলবে না চুলা।
বাবুল জানান, কোনো দিন আয় না হলে নতুন কাজের খোঁজে ভোরবেলায় বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে ভোলার লঞ্চে ওঠেন। সন্ধ্যায় আবার ঢাকার লঞ্চে ফিরে আসেন। বড় কোনো স্বপ্নের ফুরসত জোটেনি কোনো দিন। শুধু আছে অনিবার্য এক দায়—পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার, সন্তানদের টিকিয়ে রাখার, আর নিজের অস্তিত্বটুকু সম্মানের সঙ্গে ধরে রাখার সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা।
কথায় কথায় লঞ্চ ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসে। কীর্তনখোলার ঘোলা পানিতে দখিনা বাতাস দোলা দেয়, তীরে এসে আছড়ে পড়ে ছোট ছোট ঢেউ। হুইসেলের তীক্ষ্ণ অথচ গগনবিদারী শব্দে ডুবে যায় চারপাশ। সেই শব্দে মিলিয়ে যেতে থাকে বাবুলের কণ্ঠও।
শেষ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে লঞ্চ থেকে নেমে পড়েন এই প্রতিবেদক, ‘বাড়ি ফিরবেন কবে?’ ঠোঁটের কোণে আক্ষেপের হাসি ছড়িয়ে বাবুল বলে ওঠেন, ‘ভাইস্যা থাহা মাইনষের কোনো ফিরনের তাগিদ থাহে না।...পথই হ্যাগো ঘর!’