রাশিয়ার ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পাচার পাটগ্রামের চার তরুণ 

ভালো বেতনের চাকরির কথা বলে ৮ মে তাঁদের মস্কোতে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁদের পাসপোর্ট, ভিসা ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের চার বন্ধু। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ধারদেনা করে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ঠাঁই হয়েছে দেশটির এক অজ্ঞাত যুদ্ধশিবিরে। ঢাকার উত্তরার আরএস ইন্টারন্যাশনাল নামের রিক্রুটিং এজেন্সি পোশাক কারখানা ও আইটি ফার্মে চাকরি দেওয়ার নামে তাঁদের রাশিয়ার এক ‘ভাড়াটে যুদ্ধ বাহিনীর’ কাছে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ।

ওই চার তরুণ হলেন টেপুরগাড়ি এলাকার নাজমুল আলম (২১), মেহেদী হাসান (২১), সর্দারপাড়ার আল আমিন (২০) ও আবদুল্লাহ আল মামুন (২২)। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে আবদুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, তাঁদের ড্রোন কারখানায় কাজের কথা বলা হলেও বাস্তবে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি রাশিয়ায় ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নেন। পরে আরএস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে গত ৮ মে বাহরাইন হয়ে তাঁদের মস্কোতে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট, ভিসা ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে অন্যের ফোন ব্যবহার করে তাঁরা পরিবারের কাছে নিজেদের অবস্থার কথা জানাতে পারেন।

ঢাকার উত্তরার আরএস ইন্টারন্যাশনাল নামের রিক্রুটিং এজেন্সি পোশাক কারখানা ও আইটি ফার্মে চাকরি দেওয়ার নামে তাঁদের রাশিয়ার এক ‘ভাড়াটে যুদ্ধ বাহিনীর’ কাছে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ।

আবেদন, সংবাদ সম্মেলন, মামলা

নাজমুল আলমের বড় ভাই লিয়াদ আলী গত ২৩ মে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ও মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেছেন। এর আগে ২২ মে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার উইংয়ের মহাপরিচালকের কাছেও চার তরুণকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদন করেন। পরে ২৬ মে পাটগ্রাম উপজেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে নাজমুলের বোন আইরিন আখতার অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর পাটগ্রাম উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি মো. ইউনুস আলী, পৌর শাখার আমির মো. সোহেল রানা এবং তাঁর কর্মচারী মাহিন বিদেশে চাকরির কথা বলে চারজনের কাছ থেকে মোট ৩৬ লাখ টাকা নেন। পরে তাঁদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে কাগজপত্র ছিনিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে ইউনুস আলী ও মাহিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনার পর ২০ মে জামায়াত তাঁদের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। পরে ২৯ মে জামায়াতে ইসলামী পাটগ্রাম উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মো. মনোয়ার হোসেনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনায় সংগঠনের কেউ জড়িত থাকলে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত দায়; দল এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হক জানান, ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক চারটি মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলো তদন্তাধীন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইউনুস আলী, সোহেল রানা ও মাহিনকে আসামি করা হয়েছে।

নাজমুলের বড় ভাই লিয়াদ আলী বলেন, চারজনের দেশে ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য তাঁরা পাননি। তবে অভিযোগ করার পর সরকার সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে বলে শুনেছেন।

পরিবারগুলো নিঃস্ব, সন্তানদের ফেরত চায়

চার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, টাকা জোগাড়ে তাঁরা জমি বন্ধক রেখেছেন, ঋণ নিয়েছেন এবং সঞ্চিত টাকা ব্যয় করেছেন। আল আমিনের বাবা আফজাল হোসেন বলেন, ফসলি জমি বন্ধক ও ঋণ করে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন। মামুনের স্ত্রী দীপ্তি আক্তার বলেন, ভালো ভবিষ্যতের আশায় স্বামী বিদেশে গিয়েছিলেন, এখন তাঁর জীবন নিয়েই শঙ্কা। নাজমুল ও মেহেদীর পরিবারও একই ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরিবারগুলোর দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।

নাজমুলের বড় ভাই লিয়াদ আলী বলেন, চারজনের দেশে ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য তাঁরা পাননি। তবে অভিযোগ করার পর সরকার সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে বলে শুনেছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছি। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

৭ জুন উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের আরএস ইন্টারন্যাশনালের ঢাকা অফিস বন্ধ পাওয়া যায়। ভবনের নিরাপত্তারক্ষী আবদুল আউয়াল জানান, মে মাসের শুরু থেকে লোকসমাগম কমতে থাকে। ঈদের ছুটির পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ।

‘কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ শুরু হয়েছে’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু বলছে, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার। গত বছর ৪ হাজার ৬৬৩ জন দেশটিতে গেছেন, যা ২০২৪ সালে ছিল ৯৯৩ জন। ভালো বেতন ও নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের নজরে এনেছিলাম। তথ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছিলাম একটি চক্র বাংলাদেশি তরুণদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে; কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা জঘন্য অপরাধ। এর সঙ্গে জড়িত কোনো চক্র বা গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

রামরুর তথ্য অনুযায়ী, পাটগ্রামের চার তরুণ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঈদের আগে আরও ৩০ যুবককে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং তাঁরা বন্দী আছেন।

৭ জুন উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের আরএস ইন্টারন্যাশনালের ঢাকা অফিস বন্ধ পাওয়া যায়। ভবনের নিরাপত্তারক্ষী আবদুল আউয়াল জানান, মে মাসের শুরু থেকে লোকসমাগম কমতে থাকে। ঈদের ছুটির পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রতারণামূলকভাবে ৩০ যুবককে রাশিয়ায় পাঠিয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে আরএস ইন্টারন্যাশনাল, জাবাল-ই-নূর এবং টিএস ওভারসিস লিমিটেড নামের তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা জঘন্য অপরাধ। এর সঙ্গে জড়িত কোনো চক্র বা গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ প্রতারণামূলকভাবে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশিকে দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।