হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর জে সি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক মোস্তাক আহাম্মদ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার গাছ লাগিয়েছেন
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর জে সি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক মোস্তাক আহাম্মদ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার গাছ লাগিয়েছেন

যেখানেই খালি জমি পান গাছ লাগান শিক্ষক মোস্তাক, পরিচর্যাও করেন নিয়মিত

সবুজেরও একটি ভাষা আছে—নীরব, কিন্তু গভীর। সেই ভাষা বোঝেন মোস্তাক আহাম্মদ। তাই তো তিনি গাছ লাগান, শুধু লোকদেখানোর জন্য নয়; বরং ভবিষ্যৎকে সবুজে রাঙানোর স্বপ্নে।

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর জে সি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শারীরিক শিক্ষার এই শিক্ষক হৃদয়ে একজন নিবেদিত পরিবেশপ্রেমী। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর বৃক্ষরোপণের পথচলা আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

রাস্তার ধারে, স্কুলের আঙিনায়, মসজিদ-মাদ্রাসা, কবরস্থান কিংবা পতিত জমি—যেখানেই খালি মাটি দেখেছেন, সেখানেই তিনি রোপণ করেছেন প্রাণ। এখন পর্যন্ত তাঁর হাতে লাগানো গাছের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। প্রতিটি চারা যেন তাঁর কাছে একেকটি সন্তান। সবুজের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা নিছক দায়িত্ববোধ নয়, যেন এক অন্তর্গত টান। তাঁর বৃক্ষরোপণের যাত্রা আজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপজেলায়।

মোস্তাক আহাম্মদের লাগানো গাছের মধ্যে আছে কাঁঠাল, আম, জাম, লিচু, বেল, জলপাই, কতবেল, পেয়ারা, লটকনসহ নানা প্রজাতির ফলদ বৃক্ষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চারাগুলো বড় হয়ে এখন ফল দিচ্ছে। বিশেষ করে জগদীশপুর জে সি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে কাঁঠাল, আম ও পেয়ারাগাছে ফল ধরায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তৈরি হয়েছে আনন্দের এক অন্য রকম আবহ।

শুধু গাছ লাগানোতেই থেমে থাকেননি মোস্তাক আহাম্মদ। প্রতিটি গাছের চারপাশে বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পরিচর্যা করা, পানি দেওয়া—সবকিছুতেই তাঁর যত্ন সন্তানের প্রতি মমতার মতো। সকাল-বিকেল সময় বের করে তিনি গাছগুলোর খোঁজ নেন।

শুধু গাছ লাগানোতেই থেমে থাকেননি মোস্তাক আহাম্মদ। প্রতিটি গাছের চারপাশে বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পরিচর্যা করা, পানি দেওয়া—সবকিছুতেই তাঁর যত্ন সন্তানের প্রতি মমতার মতো

বৃক্ষপ্রেমী মোস্তাক আহাম্মদ বলেন, ‘শুধু গাছ লাগানোই নয়, প্রতিটি গাছের যত্ন নেওয়াকেও আমি সমান গুরুত্ব দিই। গাছগুলোর চারপাশে বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পরিচর্যা করা এবং বড় করে তোলার জন্য আমি নিজেই সময় ও শ্রম দিয়ে থাকি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা চিন্তা করে আমি তালবীজ ও খেজুরের বীজও রোপণ করেছি। আমার বিশ্বাস, গাছ আমাদের জীবন বাঁচায়, পরিবেশকে সুন্দর রাখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলে। আমি চাই, সমাজের সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে এসে বেশি বেশি গাছ লাগাক। তাহলে আমাদের দেশ একদিন সত্যিই সবুজে ভরে উঠবে।’

স্থানীয় বেলঘর গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ শামীম বলেন, ‘মোস্তাক স্যারের মতো মানুষ খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু গাছ লাগান না, প্রতিটি গাছকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখেন। অনেক সময় দেখেছি, রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। তাঁর এই ভালোবাসা আমাদেরও অনুপ্রাণিত করে।’

আগে এই রাস্তাগুলো ফাঁকা ছিল, গরমে হাঁটা যেত না জানিয়ে সন্তোষপুর এলাকার ফয়েজ আহমেদ বলেন, এখন গাছের ছায়া হয়েছে, পরিবেশটা অনেক শান্ত লাগে।

মোস্তাক আহমেদ তাঁর শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেন

স্থানীয় তরুণ মাহমুদ হাসান বলেন, ‘স্যার আমাদেরও গাছ লাগাতে উৎসাহ দেন। অনেক সময় নিজে চারা এনে হাতে তুলে দেন। তাঁর কারণে এখন আমরা বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগানোর চেষ্টা করছি।’

পরিবেশকর্মী ওমাইয়া ফেরদৌস বলেন, ‘একজন মানুষের উদ্যোগ কীভাবে পুরো এলাকার পরিবেশ বদলে দিতে পারে, মোস্তাক স্যার তার বাস্তব উদাহরণ। তাঁর লাগানো গাছগুলো আজ শুধু সবুজই বাড়াচ্ছে না, মানুষের চিন্তাভাবনাও বদলে দিচ্ছে।’

মোস্তাক আহাম্মদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয় মন্তব্য করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, মোস্তাক আহমেদ শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেন, যা তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীরাই দেশকে আরও সবুজ করে তুলবে।