আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে
আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে

অধ্যাদেশ বাতিল মানে জুডিশিয়ারির হৃৎপিণ্ডে হাত দেওয়া : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন

সরকারের উদ্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলেছেন, ‘বিচারক নিয়োগ কীভাবে হবে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে অধ্যাদেশ হয়েছিল। মাসদার হোসেন মামলার (বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণসংক্রান্ত মামলা হিসেবে পরিচিত) রায়ের প্রতিফলন হলো অধ্যাদেশ দুটি। সেদিন আইন দুটি বাতিল করে দেওয়া হলো।...বাতিল করা মানে আপনি আপনার জুডিশিয়ারির হৃৎপিণ্ডে হাত দিয়ে দিয়েছেন। আপনি সর্বনাশ ডেকে আনছেন।’

আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এম এ মতিন এ কথা বলেন। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর: স্বাধীনতা আর কত দূর?’ শিরোনামে ওই মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন এবং মাসিক আইন ও বিচার পত্রিকা।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, আইন দুটি (অধ্যাদেশ দুটি) বাতিল করে তারা বলছে, এর চেয়ে ভালো আইন করবে। আইন করার পর চাইলে তাদের সংশোধন করার ক্ষমতা আছে। এটা আইনই করল না...আবার নিয়ে আসবে কীভাবে?

না বুঝেই এটা করা হয়েছে বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এরা আত্মঘাতী কাজ করছে। দুই-তৃতীয়াংশ ভোট আমরাই দিয়েছি তাদের। দুই-তৃতীয়াংশ ভোট তো আকাশ থেকে আসে নাই। এখন তারা আমাদের বিরুদ্ধে লেগে গেল।...যা ইচ্ছা তা–ই করবেন—এটা হবে না। যা ইচ্ছা তা–ই করবে জনগণ, সংসদ নয়। সংসদ যা বলবে, এটাই শেষ কথা নয়। সংসদের পরে আছে আদালত।’

শিক্ষার্থীরা, যাদের বলা হয় ‘আবাবিল’, যারা আন্দোলন করে অভ্যুত্থান করে অধিকার দিয়েছে উল্লেখ করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, জুলাই কর্মকাণ্ড-বিপ্লবের ফলে আবাবিলেরা যে ক্ষমতা পেল, সেই ক্ষমতাবলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হলো, সেই ক্ষমতাবলেই অধ্যাদেশগুলো হলো। সেই ক্ষমতাবলেই এই সংস্কারগুলো। এগুলোর প্রত্যেকটাই হচ্ছে আইন। কারণ, এটা মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এটাই আইন।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘তাহলে এগুলো যারা বাতিল করল, এগুলো করতে নারাজ, সচিবালয় করছে না, বিচারক নিয়োগ শুধু ওদের হাতে নিয়ে যাবে—এগুলো হচ্ছে আত্মঘাতী।...সর্বনাশ হয়ে যাবে।...এগুলো আমরা নিন্দা করি। শুধু নিন্দা করি না, উপদেশ দিই—এগুলো করিয়ো না। যা জনগণ চায়, সেটা করো। জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেয়ো না।’

জুলাই সনদকে সম্মান জানানোর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে এম এ মতিন বলেন, ‘জনতার দাবিগুলো মেনে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করুন। সংস্কারগুলো করার আন্তরিকতা আছে, তা দেখান। প্রমাণ দেন।’

সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ জনগণ

নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণসংক্রান্ত মামলার অন্যতম বাদী অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন বলেন, ‘বলতে চাই, বিচার বিভাগ এত অবহেলিত, এত সৎমাসুলভ আচরণ করা হয়, ৫৪ বছর যাবৎ হচ্ছে—এর বেটারমেন্টের জন্য কেউ চিন্তা করে না।’

সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ জনগণ উল্লেখ করে মাসদার হোসেন বলেন, ‘আজকে এতগুলো বিষয় কলমের খোঁচায় ক্ষমতা আছে মসনদে বসে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই মুহূর্তে হ্যাঁ-না ভোট করুন, জরিপ করুন, ৯৯ ভাগ লোক আপনাদের কাজের বিরুদ্ধে মতামত দেবে।...যেগুলো হচ্ছে সেগুলো ঠিক হচ্ছে—এভাবে বিচার বিভাগকে পদদলিত করা? গুম হয়ে যাঁরা মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তাঁরা আজ সংসদ সদস্য। তাঁদের জিজ্ঞেস করে গুমের সংজ্ঞা ঠিক করুন।’

ফল ভালো হবে না

মাসদার হোসেন বলেন, ‘ভোট মানে কী, এমপি সাহেবরা বলেন ভোট দেন রাস্তা করব, কালভার্ট করব, মসজিদ-মন্দির করব। এটা তাঁদের দায়িত্ব না, তাঁরা সংসদ সদস্য, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃত্তি, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাঁরা আইন তৈরি করবেন। সেই আইনও যদি জনবান্ধব না হয়, সংসদ তা বাতিল করবে। এই মূলনীতি, এই সত্য, এই জুরিসপুডেন্সের অ্যাসপেক্টে তাঁরা নাই।’

সরকারের উদ্দেশে মাসদার হোসেন বলেন, ‘আপনারা গায়ের জোরে গুটিকয়েক মানুষের চিন্তাচেতনা, কুমন্ত্রণায় আজকে আপনারা এই কাজগুলো করছেন। এর কনসিকোয়েন্স (ফল) ভালো হবে না। এই দিন দিন না। আরও দিন আছে।...জনগণ এ দেশের আন্দোলনমুখী, রক্ত দেওয়ার অভ্যাস আছে। আবার আন্দোলনে নামবে জনগণ এবং আপনারা যদি পথ হারিয়ে ফেলেন, আপনাদের সঠিক পথে জনগণ তুলে নিয়ে আসবে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে অধস্তন আদালতের কয়েকজন বিচারককে শোকজ করার প্রসঙ্গ তোলেন সাবেক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় জজদের শোকজ করেছে। মনে রাখবেন একজন জজের এক দিনের ছুটি, একটা আলপিনের প্রয়োজন হলেও সংবিধান অনুযায়ী সেটি সুপ্রিম কোর্টের কাছে যেতে হয়। আইনমন্ত্রী শোকজ করেছেন কোন কর্তৃত্ববলে?’

সরকারের উদ্দেশে মাসদার হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছে আশা করছি, আপনারা একটু চিন্তা করুন জনস্বার্থে। জুলাই আন্দোলনকারীদের রক্তের ওপর আপনাদের মসনদ বসা আছে। আপনারা এমনি এমনি উড়ে আসেননি।...এ দেশের হৃদয়বান জনসাধারণ, ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়েছেন। তাঁদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করবেন না।’

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। অন্যদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক ও ওমর ফারুক, আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী, সাবেক যুগ্ম জজ মো. সাজ্জাদ হোসেন ও গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল আলোচনায় অংশ নেন।