শরীফ ভূঁইয়ার লেখা

আমরা কি উল্টো পথে হাঁটছি

ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সেগুলোর কিছু পরে বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অন্যগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো অনিশ্চিত।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান। তাঁদের লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি যাত্রাবাড়ী, ঢাকা, ২০ জুলাই ২০২৪
ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

বাংলাদেশ ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সেগুলোর কিছু পরে বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অন্যগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো অনিশ্চিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়কে (ওএইচসিএইচআর) জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য অনুরোধ করা। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের জন্য এ অনুরোধ করেন।

ওএইচসিএইচআর তদন্তের পর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন: বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত বিক্ষোভের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহার’ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য

ওএইচসিএইচআরের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সহিংস গোষ্ঠীর সহযোগিতায় যে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। এসবের মধ্যে ছিল ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বেআইনি শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিন্নমত দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে এসব নিপীড়ন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে। নাগরিক প্রতিরোধ দমন করা এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো গোপন করার উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ, নজরদারি, গণমাধ্যমকে ভীতি প্রদর্শন এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ১ হাজার ৪০০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ১১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের সমর্থক, পুলিশ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সুপারিশমালা

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে ও তার আগে বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিরা যেন ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পান। এ ছাড়া দমন-পীড়নের কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবিলা করার লক্ষ্যে ‘গভীর সংস্কার’ প্রস্তাব করা হয়। ওএইচসিএইচআরের সাক্ষাৎকার নেওয়া অনেক ভুক্তভোগী জোর দিয়ে বলেছেন যে তাঁরা দেশে ‘প্রকৃত পরিবর্তন আনার জন্য’ নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন।

সুপারিশগুলো পাঁচটি ভাগে পেশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় ১৮ মাস পরে মনে হচ্ছে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া পথ হারিয়েছে।

জবাবদিহি ও বিচার বিভাগ

ওএইচসিএইচআর জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে ও তার আগে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, গুম এবং যৌন সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের কথা বলেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক সদস্যদের নিয়মিত আদালতে বিচার করা, একটি অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার (ট্রানজিশনাল জাস্টিস) কাঠামো প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন সরকারি কৌঁসুলি (পাবলিক প্রসিকিউশন) ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গুমসংক্রান্ত কমিশনকে সহায়তা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

ওএইচসিএইচআরের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি অনুমোদন ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। তবে বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহাল করে।

অন্তর্বর্তী সরকার এসব ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনকে প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা হয় এবং ওএইচসিএইচআরের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি অনুমোদন ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। তবে বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনর্বহাল করে। প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এর অধীনে মানবাধিকার কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে না।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারত। এর মধ্যে ছিল বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জনবল নিশ্চিত করা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিষয়ক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি স্বাধীন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করা। দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সরকার দুটি আইনই বাতিল করেছে।

শরীফ ভূঁইয়া

ওএইচসিএইচআরের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক সদস্যদের নিয়মিত আদালতে বিচার করা হচ্ছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬ অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের কিছু উপাদান অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন প্রতিশোধমূলক সহিংসতার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের কোনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন—উভয়ের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বাধীন পাবলিক প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গঠন করা হয়নি।

গুমের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়াকে ওএইচসিএইচআর গুরুত্ব দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫ মানবাধিকার কমিশনকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা দিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশের মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে দিয়েছে। ফলে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত গুমের ঘটনা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর বিধান ছাড়া গুমের ঘটনা মোকাবিলার জন্য বর্তমানে কোনো আইনি কাঠামো নেই।

মৃত্যুদণ্ডের ওপর সময়সীমা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিভিন্ন উদ্বেগ মোকাবিলার বিষয়ে ওএইচসিএইচআরের সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগ

ওএইচসিএইচআরের প্রাণঘাতী গোলা–বারুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সুপারিশ এখন পর্যন্ত অনুসরণ করা হচ্ছে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিল, তবে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০২৪ সাল বা তার আগের বছরগুলোতে ঘটা গণমামলার ভিত্তিতে গণগ্রেপ্তারের ঘটনা এখন আর ঘটছে না। ফৌজদারি কার্যবিধির একটি সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭৩এ ধারা সংযোজন করা হয়েছে, যার ফলে পুলিশ এ ধরনের মামলায় অব্যাহতি দেওয়ার জন্য প্রতিবেদন দিতে পারে।

ওএইচসিএইচআরের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলে স্বাক্ষর করে। এই প্রটোকল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশেও সংশোধনী আনা হয়েছিল। তবে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর প্রটোকলটি বাস্তবায়নের জন্য দেশে কোনো আইনি ব্যবস্থা বিদ্যমান নেই।

সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা, র‍্যাব বিলুপ্ত করা এবং বিজিবিকে শুধু সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়ে এবং ডিজিএফআইকে সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখাসংক্রান্ত ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশগুলো প্রতিস্থাপন করা এবং একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা বিষয়ে ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে একটি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল, বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশকে অকার্যকর হতে দিয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা, র‍্যাব বিলুপ্ত করা এবং বিজিবিকে শুধু সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়ে এবং ডিজিএফআইকে সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখাসংক্রান্ত ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বাতিল হয়ে যাওয়া মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশের মাধ্যমে এসব বাহিনীর জন্য যে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, সেগুলোও বর্তমানে আর কার্যকর নেই।

নাগরিক পরিসর

নাগরিক পরিসরের সুরক্ষার জন্য ওএইচসিএইচআর সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩, অফিশিয়াল সিক্রেটস আইন ১৯২৩, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯, দণ্ডবিধির মানহানিসংক্রান্ত ফৌজদারি বিধান এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল বা সংশোধনের সুপারিশ করেছিল। সাইবার নিরাপত্তা আইনকে একটি নতুন আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাতে অস্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধগুলো বিলোপ করা হয়েছে। তবে অন্য আইনগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ওএইচসিএইচআর বেআইনি নজরদারি বন্ধ করার, জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) বিলুপ্ত করার এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ (বিটিএ)-এর অস্পষ্ট বিধানগুলো—যার আওতায় এনটিএমসি কাজ করে—সংশোধনের সুপারিশ করেছিল। বিটিএর বিধানগুলো সংশোধন করা হয়েছে, তবে এনটিএমসি বিলুপ্ত করা হয়নি। ইন্টারনেট বন্ধ করা রোধ করার সুপারিশটি বিটিএ সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

ওএইচসিএইচআরের সুপারিশ অনুযায়ী সংগঠনের স্বাধীনতা সীমিত করার উদ্দেশ্যে যেন বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন ২০১৬ ব্যবহার করা না হয়, সে জন্য আইনটি সংশোধন করা হয়েছে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে যদিও বলা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ সরকার দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল, তবু ওএইচসিএইচআর রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে মত দিয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা না হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দুদকের কিছু সংস্কার–উদ্যোগ নিয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং কমিশনে একজন নারী কমিশনারের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ওই অধ্যাদেশটি মেয়াদ শেষে অকার্যকর হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নারী প্রার্থীর এবং নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের সংখ্যার স্বল্পতা এটা স্পষ্ট করে যে প্রকৃত সমতা অর্জন এখনো অনেক দূরে।

অর্থনৈতিক সুশাসন

অর্থনৈতিক ব্যবস্থা–সম্পর্কিত সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা, চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করা, শ্রম অধিকার উন্নত করা, আরও ন্যায়সংগত কর–ব্যবস্থা চালু করা, তরুণ ও বেকার মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা।

অন্তর্বর্তী সরকার দুদকের কিছু সংস্কার–উদ্যোগ নিয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং কমিশনে একজন নারী কমিশনারের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ওই অধ্যাদেশটি মেয়াদ শেষে অকার্যকর হয়েছে। চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রচেষ্টা বাস্তবে কতটা সম্পদ পুনরুদ্ধারে সফল হয়, তা দেখতে আরও সময় লাগবে।

শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ সংগঠন করার স্বাধীনতাসহ শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি এনেছে, যা বর্তমান সরকার বহাল রেখেছে। কর–ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করার লক্ষ্যগুলো এখনো দূরের বিষয়।

বাংলাদেশ ওএইচসিএইচআরের সুপারিশগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সেগুলোর কিছু পরে বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, অন্যগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো অনিশ্চিত।

এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে আমরা শুধু ওএইচসিএইচআরের সুপারিশ বাস্তবায়নেই অসফল হব না; বরং ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক শাসনের যে আকাঙ্ক্ষায় জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তা–ও যথার্থভাবে পূরণ করতে ব্যর্থ হব।

* ড. শরীফ ভূঁইয়া: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিজিটিং ফেলো; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী