
রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাইলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিগত বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যম বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিপীড়িত হলেও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ নতুন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জেগে উঠেছে। এই নতুন বাংলাদেশে উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা তাঁদের বক্তব্যে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন। আজ শনিবার রাজধানী বনানীর একটি হোটেলে এই অনুষ্ঠান হয়। বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠানে এসে তারেক রহমান সম্পাদকদের বিভিন্ন পরামর্শ ও উদ্বেগের কথা শোনেন।
যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান তাঁর বক্তব্যে জিয়া পরিবারের জনপ্রিয়তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জীবিত অবস্থায় জানতেন না তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর জানাজায় অবিস্মরণীয় লোকসমাগমই তা প্রমাণ করেছিল। এরপর খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাও আমরা দেখেছি। বর্তমানের সমীক্ষাও বলছে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। তবে এই জনপ্রিয়তা ও আগ্রহকে ভোটে পরিণত করে ক্ষমতায় যেতে হবে।’
শফিক রেহমান সুনির্দিষ্ট দুটি প্রস্তাব দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেন আর কখনো বিলিয়ন ডলার চুরি না হয়, সে জন্য এখনই স্পেশাল কমিটি করা উচিত। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীকে নতুন নৈতিকতায় শিক্ষিত করতে হবে। এ ছাড়া সাংবাদিকদের জন্য আলাদা আইন না করে বর্তমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান তিনি।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম গণতন্ত্রের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ক্লাইমেট চেঞ্জ। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের অবস্থা ভয়াবহ। এ ছাড়া আমরা আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার উত্তোলন করতে করতে এমন পর্যায়ে গেছি যে পানির স্তর ৬০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। আমাদের নদীগুলো দূষিত হচ্ছে। আগামী রাজনীতিতে এই বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ তিনি বিএনপির নতুন যাত্রায় এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিতে তাঁর পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বর্তমান পরিস্থিতির সংকট তুলে ধরে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমরা অনেকটাই স্বাধীন, আবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণ আসছে মব ভায়োলেন্স থেকে। যখন সংবাদপত্রের অফিসে আগুন দেওয়া হয়, তখন ভাবতে কষ্ট হয় আমরা বেহেশতে আছি, না জাহান্নামে। তারেক রহমান সাহেব পশ্চিমা বিশ্বে মিডিয়া চলাচলের সংস্কৃতি দেখে এসেছেন, আশা করি তিনি সেই পরিবর্তন আনবেন। বর্তমানে যে উগ্রবাদ আমাদের গ্রাস করতে চাইছে, তা থেকে দেশ মুক্ত করতে তাঁর নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।’
নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল যদি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চায়, তবে তাদের দায় হচ্ছে সাংবাদিকতার স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগের তুলনায় সংবাদমাধ্যম বেশি সহনশীলতা পেয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান মানুষের মননে যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, সেখানে আর কোনো পুরোনো জমানার নিয়ন্ত্রণ চলবে না। কোনো দল ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র এই জবাবদিহি জারি রাখতে হবে।’
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং ফিরে এসেও জানার চেষ্টা করেননি আসলে কী হয়েছিল। তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় পক্ষের কথাকেই ইতিহাস হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, যে কারণে তিনি ব্যর্থ হন।’ তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনার চারপাশের লোকজন আপনাকে যা বলছে, আপনি সেটাই শুনছেন। কিন্তু ১৭ বছরের প্রকৃত ইতিহাস এটা না। সেই ইতিহাস আমি আপনার কাছে বর্ণনা করব।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তারেক রহমান সাংবাদিকদের গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সমালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়। এমন সমালোচনা চাই, যা দেশের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে।’
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, ইউএনবির প্রধান সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান, যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক ইনাম আহমেদ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সংবাদের সম্পাদক আলতামাশ কবির, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ, কাউন্টার পয়েন্টের সম্পাদক জাফর সোবহান, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, আজকের পত্রিকার সম্পাদক কামরুল হাসান, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবর, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক আবু তাহের, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, ডেইলি সানের সম্পাদক মো. রেজাউল করিম, সুরমার (লন্ডন) সম্পাদক শামসুল আলম লিটন, কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, বাসসের চেয়ারম্যান আনোয়ার আল দীন, মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, দেশ বার্তার সম্পাদক সালেহ বিপ্লব।
বাসসের প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, ইউএনবির সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু, ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, ঢাকা মেইলের সম্পাদক হারুন জামিল, ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল ইসলাম, বিবিসির সম্পাদক মীর সাব্বির মোস্তফা, বিশেষ প্রতিনিধি কাদির কল্লোল, আল-জাজিরার তানভীর চৌধুরী, রয়টার্সের রুমা পাল, এএফপির শেখ সাবিহা আলমও উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মাহবুব আলম, বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক জেড এম জাহেদুর রহমান, বেসরকারি টেলিভিশনের শীর্ষ প্রধানদের মধ্যে সময় টিভির জুবায়ের আহমেদ, চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজ, বাংলা ভিশনের আবদুল হাই সিদ্দিকী, এনটিভির ফখরুল আলম কাঞ্চন, মোস্তফা খন্দকার, ইটিভির আবদুস সালাম, যমুনা টিভির ফাহিম আহমেদ, মাছরাঙার রেজওয়ানুল হক, ডিবিসির লোটন একরাম, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের জহিরুল আলম, একাত্তর টিভির শফিক আহমেদ, এটিএন বাংলার হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, বৈশাখী টিভির জিয়াউল কবীর সুমন, নিউজ টোয়েন্টিফোরের শরীফুল ইসলাম খান, গ্রীন টিভির মাহমুদ হাসান, গাজী টিভির গাউসুল আজম দীপু, এটিএন নিউজের শহীদুল আজম, আরটিভির ইলিয়াস হোসেন, মোহনা টিভির এম এ মালেক, স্টার টিভির ওয়ালিউর রহমান মিরাজ, এখন-এর তুষার আবদুল্লাহ, ইনডিপেনডেন্টের মোস্তফা আকমল, মাইটিভির ইউসুফ আলী উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমীন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, শাম্মী আখতার, শায়রুল কবির খান, চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল এবং দলের চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।