ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা
ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা

এডিস মশা মারার ছয় ওষুধের পাঁচটিতেই কাজ হচ্ছে না, ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা

বহুল ব্যবহৃত এডিস মশা মারার ওষুধের (মশানাশক) বেশির ভাগেই আর কাজ হচ্ছে না। এসব ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।

পরীক্ষায় কার্যকর পাওয়া গেছে অর্গানোফসফেট শ্রেণির ম্যালাথিয়ন। এটি প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—দুই শহরেই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা ৯৮ শতাংশ মশা মারা গেছে।

গবেষণা শুরু হয় ২০২৩ সালে। এটি এখনো চলছে। চলতি মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এশিয়া প্যাসিফিক মসকিউটো অ্যান্ড ভেক্টর কন্ট্রোল কনফারেন্সে এটি তুলে ধরা হয়। আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল।
এডিস মশা নিধনে ওষুধ স্প্রে করছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন কর্মী। রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায়

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মশানাশকগুলোর এডিস–প্রতিরোধী হয়ে ওঠা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নতুন কোনো ওষুধ প্রয়োগ করলে সেটাও অকার্যকর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। বিজ্ঞানে একে ‘ক্রস রেজিস্ট্যান্স’ বলা হয়। ডেঙ্গুর মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে এ পরিস্থিতি।

এখন মশা নিধনে শুধু রাসায়নিকে কাজ হবে না। এর পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তির দরকার। বেশি দরকার মশা, রোগী ও ওষুধে মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়ে নজরদারি।
মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ

ছয়টির পাঁচটিতেই কাজ হচ্ছে না

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে এডিস মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার ১ হাজার ৪৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সরাসরি লার্ভা সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করা হয়েছে। পরে গবেষণাগারে প্রজাতি শনাক্ত এবং মশানাশকের সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা হয়।

মাঠ থেকে সংগ্রহ করা প্রথম প্রজন্ম এবং সেগুলো থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্ম—দুই ধরনের মশার ফল আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। মশানাশক প্রয়োগের ১ ঘণ্টা এবং ২৪ ঘণ্টা পর মৃত্যুহার হিসাব করা হয়।

গবেষণায় পাইরেথ্রয়েড, কার্বামেট ও অর্গানোফসফেট—এই তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করা হয়। পাইরেথ্রয়েড শ্রেণির ডেল্টামেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও ইটোফেনপ্রক্স—চারটির বিরুদ্ধেই এডিস ইজিপ্টির প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। মশা এসব ওষুধে মরছে না।

কার্বামেট শ্রেণির বেন্ডিওকার্বেরও একই অবস্থা। শুধু অর্গানোফসফেট শ্রেণির ম্যালাথিয়নের প্রতি মশা এখনো সংবেদনশীল।

গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এডিস ইজিপ্টি মশার মধ্যে পাইরেথ্রয়েড ও বেন্ডিওকার্ব প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। বিপরীতে ম্যালাথিয়ন এখনো কার্যকর।

গবেষণায় পাইরেথ্রয়েড, কার্বামেট ও অর্গানোফসফেট—এই তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করা হয়। পাইরেথ্রয়েড শ্রেণির ডেল্টামেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও ইটোফেনপ্রক্স—চারটির বিরুদ্ধেই এডিস ইজিপ্টির প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। মশা এসব ওষুধে মরছে না।

কোন মশানাশক কতটুকু প্রতিরোধী

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল পাওয়া গেছে পারমেথ্রিন পরীক্ষায়। পারমেথ্রিনের শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ ঘনত্ব প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকায় মাত্র ১০ শতাংশ মশা মারা যায়। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ মশাই বেঁচে ছিল। চট্টগ্রামে মৃত্যুহার ছিল আরও কম—৭ শতাংশ।

এই রাসায়নিকের ঘনত্ব ১০ গুণ বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করার পরও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ঢাকায় ৭৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৮৪ শতাংশ মশা বেঁচে ছিল।

ইটোফেনপ্রক্সের ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকার ৯৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রামের ৯০ শতাংশ মশা ২৪ ঘণ্টা পরও বেঁচে ছিল। ডেল্টামেথ্রিনের শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকার ৮৩ এবং চট্টগ্রামের ৮৪ শতাংশ মশা বেঁচে যায়। তবে রাসায়নিকটির ঘনত্ব বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুহারও বেড়েছে। আলফা-সাইপারমেথ্রিনের শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকার ৬৮ শতাংশ এবং চট্টগ্রামের ৮৩ শতাংশ মশা বেঁচে ছিল। শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ঘনত্বেও ঢাকার ৫৭ ও চট্টগ্রামের ৩৪ শতাংশ মশা বেঁচে যায়। কার্বামেট শ্রেণির বেন্ডিওকার্বের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ঘনত্বে ঢাকার ৪৪ ও চট্টগ্রামের ৩৫ শতাংশ মশা ২৪ ঘণ্টা পরও বেঁচে ছিল।

মাঠের মশা থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পরীক্ষায় মৃত্যুহার ছিল ৯৯ শতাংশ। তবে একটি রাসায়নিক এখনো কার্যকর—এ কারণে সেটির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা নিরাপদ নয়। একই রাসায়নিক একটানা ও নির্বিচারভাবে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে সেটির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন গবেষকেরা।

পরীক্ষিত ছয়টি মশানাশকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে ম্যালাথিয়ন। ৫ শতাংশ ঘনত্বের ম্যালাথিয়ন প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম—দুই শহরেই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা ৯৮ শতাংশ মশা মারা যায়।

এখন মশা নিধনে শুধু রাসায়নিকে কাজ হবে না। এর পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তির দরকার। বেশি দরকার মশা, রোগী ও ওষুধে মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়ে নজরদারি। এটা অনুপস্থিত। এই চিত্র হাতে থাকলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন

মাঠের মশা থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পরীক্ষায় মৃত্যুহার ছিল ৯৯ শতাংশ। তবে একটি রাসায়নিক এখনো কার্যকর—এ কারণে সেটির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা নিরাপদ নয়। একই রাসায়নিক একটানা ও নির্বিচারভাবে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে সেটির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন গবেষকেরা।

এ গবেষণাকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, এখন মশা নিধনে শুধু রাসায়নিকে কাজ হবে না। এর পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তির দরকার। বেশি দরকার মশা, রোগী ও ওষুধে মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়ে নজরদারি। এটা অনুপস্থিত। এই চিত্র হাতে থাকলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।