
বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের প্রতি সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের নতুন মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। একই সঙ্গে সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠনটি।
আজ মঙ্গলবার সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। নিউজ অ্যালার্ট হিসেবে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গতকাল সোমবার কারা কর্তৃপক্ষকে ওই সাংবাদিকদের ২৪ আগস্ট হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই সাংবাদিকেরা বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৪ সাল থেকে কারাগারে বন্দী আছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের শিক্ষার্থীদের দমন–পীড়নে উসকানি দিয়েছিলেন এই সাংবাদিকেরা। ওই অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিলেন।
প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, এই সাংবাদিকেরা ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উসকানিমূলক প্রশ্ন করেছিলেন। সেই প্রশ্ন থেকে তিনি আন্দোলনকারীদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে রক্তাক্ত দমন-পীড়ন শুরু করেছিলেন।
সিপিজের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, শুধু সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার কারণে সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করাটা সাংঘাতিক ও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
কুনাল মজুমদার আরও বলেন, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত দলীয় পক্ষপাতমূলক বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু সেগুলোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে গণ করা একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে এবং একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই অবিলম্বে তিন সাংবাদিককে মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।
একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে গত মে মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অপর একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনায় এ মামলা হয়েছে। গত ২৭ জুলাই শেখ হাসিনাসহ ৩৯ জনের সঙ্গে তাঁদের নামও এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) উল্লেখ করা হয়েছে।
দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। সাংবাদিকতার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যার মামলা দেওয়া হয়েছে বলে সিপিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, অপরাধী সাব্যস্ত হলে এই সাংবাদিকদের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তির কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা (গাইডলাইন) নেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ হাসিনা এই ট্রাইব্যুনালকে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করার জন্য ব্যবহার করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন প্রশাসন এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করেছে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করার জন্য তাঁরা ট্রাইব্যুনাল আইনও সংশোধন করেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সিপিজের পক্ষ থেকে ই–মেইল করা হলেও বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয় এবং চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।