কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস
কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস

প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

পুরোনো ভিডিওকে এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বলে ছড়ানো হচ্ছে

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য (ফেল) হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বলে একটি ভিডিও বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও আইডি থেকে ছড়ানো হচ্ছে। গতকাল সোমবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করার কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলন করছেন। ভিডিওটিতে শিক্ষার্থীদের ‘এক দুই তিন চার, শিক্ষামন্ত্রী গদি ছাড়’, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’-এ ধরনের স্লোগান দিতে দেখা যায়। ‘এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থীরা’—এই দাবি করা ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে ৩৫ এর অধিক ফেসবুকে পেজ থেকে।

লিংক: এখানে

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরের কোনো আন্দোলনের নয়। এটি গত ১৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের সচিবালয় অভিমুখী ‘লংমার্চ’-এর সময় ধারণ করা।

ফল প্রকাশের পরের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে শিক্ষার্থীদের মিছিল করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে শিক্ষার্থীরা!’

‘The Politics-দ্য পলিটিকস’ নামের পেজে ভিডিওটি দেখা হয়েছে ২৫ লাখ বার, প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৫৮ হাজার, মন্তব্য পড়েছে ৯ হাজার ও শেয়ার হয়েছে প্রায় ৭ হাজার বার।

১৮ লাখের বেশি অনুসারী থাকা ‘নাগরিক প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শুধু ওই পেজেই ভিডিওটি ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ হাজার প্রতিক্রিয়া ও ৬ হাজার মন্তব্য পড়েছে।

লিংক: এখানে

পোস্ট করা ভিডিওর মন্তব্যের ঘর পর্যালোচনা করেও দেখা যায়, অনেকেই এটিকে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ফেল করা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ভিডিও হিসেবে বিশ্বাস করেছেন। নিতিশ বড়ুয়া নামের অ্যাকাউন্ট থেক মন্তব্য করা হয়েছে, ‘যে বা যারা এই আন্দোলন করতেছে, তাদের শনাক্ত করে ওদের পরীক্ষার খাতাগুলো জনসংখ্যাকে দেখানো উচিত।’

ফারিয়া কনা নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘সারা বছর না পড়ে, টিকটক করেছিল। এখন আসছে আন্দোলন করতে’। সাজ্জাতুল ইসলাম নামের একজন ভিডিওটি এখনকার বিশ্বাস করে মন্তব্য করেছেন, এদের খাতা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক, পরীক্ষার খাতায় কী লিখছে, তা জাতি দেখতে চায়। তারপর এদের বিচার করা হবে।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে এর বিভিন্ন সময়ের স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করেছে প্রথম আলো। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ডে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে ভিডিওটির সঙ্গে মিলে যায় এমন একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়।

দেশের প্রথম সারির একাধিক সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে ১৫ জুলাই প্রকাশিত ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের একই ধরনের মিছিল ও স্লোগান দিতে দেখা যায়। এসব ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়েছিল, ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে শিক্ষার্থীদের মিছিল।’ এ ছাড়া গত ১৫ জুলাইয়ের ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোয়ও একই কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। একই সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

এসব ঘটনার পর বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর অংশ হিসেবে গত ১৫ জুলাই রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও নীলক্ষেত এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের উদ্দেশে মিছিল নিয়ে যাত্রা করেন।

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ জুলাই বেলা ৩টার পর সায়েন্সল্যাব ও নীলক্ষেত এলাকায় অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হন। মিছিলটি নীলক্ষেত মোড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি এলাকা অতিক্রম করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবির পক্ষে স্লোগান দেন। ওই কর্মসূচিরই দৃশ্য বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন—এমন কোনো ঘটনার তথ্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে পাওয়া যায়নি।