
আনন্দের ঈদ স্বজনদের সঙ্গে করতে কোটি মানুষ রাজধানী ছাড়ছে। এটা বরাবরই ঘটে, ব্যতিক্রম নয় এবারও। তবে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এই ঈদ যাতায়াত সংক্রমণ বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। সেদিকে সরকারের মনোযোগ না দেখে হতাশও তাঁরা।
ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হয়েছে আজ সোমবার। তবে তার আগে থেকেই ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। এই যাত্রা আগামী বৃহস্পতিবার ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চলবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে ঈদের আগের তিন-চার দিনে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়ে।
দেশে চলতি বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যু ইতিমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে সরকার গত ৫ এপ্রিল টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি শুরু করলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে না। ফলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্কও বাড়ছে।
এখন ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভিড়, মানুষের ব্যাপক চলাচল ও শিশুদের সংস্পর্শ বাড়ার কারণে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্যবিদ বে–নজির আহমদ এবং শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা।
বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের ভাষায়, ঈদের আনন্দের মধ্যেও এবার বাড়তি সতর্কতা জরুরি। কারণ, সামান্য অসতর্কতাও নতুন করে সংক্রমণের বড় ঢেউ তৈরি করতে পারে।
‘ঈদের পর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে’
১৮ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয় ৬৪ জনের। এর আগের সাত দিনে মারা যায় ৪০ জন।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যেভাবে সারা দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে, তাতে ঈদের ছুটির পর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে নজরুল ইসলাম বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং এটি মূলত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। যে শিশু এখনো আক্রান্ত হয়নি, সে যদি এমন এলাকায় যায়, যেখানে আগে থেকেই হাম ছড়িয়ে আছে, তাহলে আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এসে সে–ও সংক্রমিত হতে পারে।
ঈদযাত্রার সময় গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় থাকে। সেটাও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখালেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, বাস, লঞ্চ বা ট্রেনে যদি আক্রান্ত শিশু থাকে, তাহলে সেখানে অন্য শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
‘হটস্পটে গিয়ে আক্রান্ত হতে পারে শিশুরা’
জনস্বাস্থ্যবিদ বে–নজির আহমদ বলছেন, ঈদের ছুটিতে দুভাবে হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রথমত, কোনো পরিবার এমন এলাকায় যেতে পারে, যেটি ইতিমধ্যে হামের ‘হটস্পট’। সেখানে গিয়ে সুস্থ শিশুও আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশু যদি লক্ষণ নিয়েই ভ্রমণ করে, তাহলে পথে বা গন্তব্যে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
বে-নজির আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার বাইরে হামের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা খুব দুর্বল। ইতিমধ্যে সেটি প্রমাণ হয়ে গেছে। ফলে কোনো শিশু যদি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে আক্রান্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি সংকটময় হয়ে উঠতে পারে।’
বে–নজির আহমদের পরামর্শ, খুব প্রয়োজন না হলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে এবার দীর্ঘ ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো।
কী ধরনের সতর্কতা দরকার
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা মনে করেন, আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদযাত্রায় কিছু সাধারণ সতর্কতা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে। বিশেষ করে শিশুর অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, মা–বাবাকে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার সব সময় সহজ নয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুর জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো। একই সঙ্গে ভিড়পূর্ণ পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
হামের ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় বলে শিশুদের নিয়ে ভিড় এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যদি না গেলে চলে বা পরে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে পাঁচ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের এবার (ঈদে) না নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। তবে বিষয়টির সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িত। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাবধানে থাকা।
সরকারের ‘মনোযোগ নেই’
দুই সন্তানকে ঈদে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় এবার অনেকটা সাবধান ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সানাউল্লাহ। তাঁর এই সাবধানতা হাম নিয়ে। তাঁর এক সন্তানের বয়স সাত বছর, আরেকজনের চার বছরের বেশি। এই দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সানাউল্লাহ গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দীন উপজেলায় গেছেন লঞ্চে। ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে ওঠেন তিনি।
হাম সংক্রমণ থেকে কীভাবে মানুষ নিরাপদে চলবে, তার কোনো নির্দেশনা দেখতে পাননি সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে কোনো প্রচার আমার চোখে পড়েনি। আমি সাবধান থেকেছি। অনেকেই হয়তো থাকবে না।’
হামের সংক্রমণ বাড়লেও ঈদযাত্রার বিষয়টিতে সরকারের মনোযোগ না দেখার কথা বলেন বিশেষজ্ঞরাও।
অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘হাম নিয়ে ব্যাপক সরকারি জনসচেতনতামূলক প্রচার দরকার। সেটা আমরা খুব একটা দেখছি না।’
একই কথা বলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলামও। তাঁর ভাষ্যে, ‘মনে হয়েছে সরকার অমনোযোগী। হয়তো রোগটাকে মামুলি হিসেবে দেখানোর একটা চেষ্টা আছে।’
হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি এরই মধ্যে বাতিল করে তাঁদের কর্মস্থল না ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
তবে এটা মূল সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বে–নজির আহমদ।
বে-নজির আহমদ বলেন, এভাবে চিকিৎসক ও নার্সদের নির্দেশ দেওয়াটাই সহজ পন্থা। একটা পরিপত্র জারি করলেই হলো। কিন্তু রোগটা যাতে না ছড়ায়, সেটি নিয়ে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বে–নজির আহমদের মতে, সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত নজরদারি বাড়ানো ও শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।